
কামরুল০১৮৮৩০৮৮০৮৪
চুনতির চাম্বিখালের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে চুনতি ইউনিয়নের আকাশ, বাতাস, প্রকৃতির নির্মম প্রতিঘাত ও একটি জনপদের টিকে থাকার সংগ্রাম।
“একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটি সরে যায় না; সরে যায় মানুষের নিরাপত্তার অনুভূতি, কৃষকের স্বপ্ন, জেলের জাল, শিশুর ভবিষ্যৎ আর একটি জনপদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা বিশ্বাস। প্রকৃতি যখন কঠোর হয়, তখন মানুষের ঐক্যই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্রয়।”
বর্ষা বাংলার প্রাণ। আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ, বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, সবুজে মোড়া মাঠ আর নদী-খালের পূর্ণতা আমাদের সংস্কৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য। কিন্তু সেই বর্ষাই যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন সে আশীর্বাদ নয়—পরিণত হয় এক নির্মম পরীক্ষায়। প্রকৃতির সেই পরীক্ষার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আজ চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ।
গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢল ও চাম্বিখালের প্রবল স্রোত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বছরের পর বছর ধরে মানুষের শ্রমে রক্ষিত খালের বাঁধ প্রচণ্ড পানির চাপে ভেঙে যায়। শুধু একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; পানির গতিপথই পরিবর্তিত হয়ে নতুন দিক দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। ফলে চাম্বিখাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির আওতাধীন প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো, কৃষিজমি, জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা আজ গভীর ঝুঁকির মুখে।
এই দৃশ্য কেবল প্রকৌশলগত ক্ষতির হিসাব নয়; এটি একটি জনপদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ওপর প্রকৃতির নির্মম আঘাত।
চাম্বিখাল এই অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি খাল নয়। এটি কৃষকের ধানের শিষে প্রাণ জোগায়, মাছচাষির ঘেরে জীবিকার আলো জ্বালায়, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই খালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শৈশবের স্মৃতি, বহু পরিবারের জীবিকার ইতিহাস এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।
খালের গতিপথ পরিবর্তনের অর্থ শুধু পানির দিক পরিবর্তন নয়; এর অর্থ জমি ক্ষয়, ফসলহানি, মাছের ঘের ধ্বংস, বসতভিটার অনিশ্চয়তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের অবনতি। একটি খালের ক্ষতি ধীরে ধীরে একটি সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবুও এই দুর্যোগের মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি।
চাম্বিখাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড নিজেদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই দ্রুত অস্থায়ীভাবে বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি নিছক একটি মেরামতের কাজ নয়; এটি মানুষের দায়িত্ববোধ, সম্মিলিত চেতনা এবং নিজের জনপদকে রক্ষার অবিচল সংকল্পের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
যেখানে অনেক সময় সংকটের মুহূর্তে মানুষ অপেক্ষা করে অন্যের সাহায্যের, সেখানে এই সমবায়ের সদস্যরা নিজেরাই মাঠে নেমে প্রমাণ করেছেন—ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি কখনো ছোট নয়।
কিন্তু বাস্তবতা কঠিন।
বর্ষাকাল এখনো শেষ হয়নি। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি বিবেচনায় অস্থায়ী সংস্কার কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। আরও একটি ভারী বর্ষণ এলে সদ্য সংস্কার করা অংশ আবারও ভেঙে যেতে পারে। তখন ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আজ তাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি—স্থায়ী ও বিজ্ঞানভিত্তিক বাঁধ নির্মাণ।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জরুরি জরিপ, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বিশ্লেষণ, আধুনিক নকশায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত খাল খনন, পাড় সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। তাই স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে চাম্বিখাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মাস্টার মাহবুবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার যে আবেদন জানিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট।
তাঁদের আবেদন একটি সমবায়ের প্রশাসনিক দাবি নয়; এটি কৃষকের কান্না, শ্রমজীবী মানুষের আর্তি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা এবং একটি জনপদের অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন শহরের উঁচু অট্টালিকার পাশাপাশি গ্রামের একটি ভাঙা বাঁধও সমান গুরুত্ব পায়। কারণ দেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো গ্রাম, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকাও একদিন নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
আজ প্রয়োজন প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রয়োজন দুর্যোগের পরে নয়, দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি গ্রহণের সংস্কৃতি। প্রয়োজন প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানের বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা।
আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি কখনো পরাজিত হয় না। যে মানুষ কাদা মাড়িয়ে ধান ফলাতে জানে, যে মানুষ বন্যার পর আবার নতুন করে ঘর তোলে, যে মানুষ ভাঙা স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন স্বপ্ন গড়ে—সেই মানুষই বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি।
চুনতির চাম্বিখাল আবারও প্রাণ ফিরে পাক। ভাঙা পাড়ে আবার সবুজ ঘাস জন্মাক। কৃষকের মাঠ আবার সোনালি শিষে ভরে উঠুক। শিশুরা নিশ্চিন্তে নদীর পাড়ে খেলুক। মানুষের চোখে আবার নিরাপদ আগামী দিনের স্বপ্ন ফুটে উঠুক।
কারণ একটি বাঁধ রক্ষা করা মানে শুধু মাটি রক্ষা করা নয়; একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই জনপদের পাশে দাঁড়াই। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়। আর যে সমাজ তার প্রকৃতি, পানি ও মানুষকে ভালোবাসতে শেখে, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।
চাম্বিখাল বাঁচুক—বাঁচুক প্রকৃতি, কৃষি, জীবিকা ও মানুষের স্বপ্ন।
অন্তহীন শুভকামনায়—
সাংবাদিক সেলিম উদ্দিন খাঁন
সাহিত্যপ্রেমী, প্রাবন্ধিক ও মুক্তমনা লেখক
Daily Bangladesh Patrika