
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুককে লক্ষ্য করে পার্সেলের মাধ্যমে কাফনের কাপড়, গোলাপজল, আগরবাতি এবং একটি প্রাণনাশের হুমকিসংবলিত চিরকুট পাঠানোর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার পর নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ভৈরব থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, গত রোববার (১৯ জুলাই) একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রহস্যজনক পার্সেলটি পাঠানো হয়। পার্সেলের প্রেরকের ঠিকানায় ‘হরিদাস, আশুগঞ্জ’ উল্লেখ করা হলেও, ঠিকানাটি প্রকৃত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পার্সেলের সঙ্গে একটি মোবাইল নম্বরও দেওয়া হয়েছিল। পার্সেলটি পাঠানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মধ্যপাড়া এলাকায় অবস্থিত ফাতান হোমিও চিকিৎসালয়ের ঠিকানায়। ওই চিকিৎসালয়টির মালিক পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুকের স্ত্রী।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরের দিকে মো. ফারুকের ছেলে মুন্তাসির মাহমুদ ঈশান পার্সেলটি গ্রহণ করেন। প্রথমে এটি সাধারণ কোনো কুরিয়ার বলে মনে হলেও পরে পরিবারের সদস্যরা পার্সেলটি খুলে ভেতরের সামগ্রী দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেখানে এক গজ সাদা কাফনের কাপড়, একটি গোলাপজলের বোতল, একটি আগরবাতির প্যাকেট এবং হাতে লেখা একটি চিরকুট পাওয়া যায়।
চিরকুটে লেখা ছিল, “আপনি আগামী এক মাসের মধ্যে ভৈরব ছেড়ে দিন। না হলে আপনার পরিণতি ভয়ংকর হবে।” এমন বার্তা পাওয়ার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। পরে মো. ফারুক ঘটনাটি স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করেন এবং নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
ঘটনার বিষয়ে মো. ফারুক বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কখনো কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা বেআইনি আবদারের সঙ্গে আপস করেননি। তিনি মনে করেন, তার কঠোর অবস্থানের কারণে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অসাধু চক্র ক্ষুব্ধ হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “আমি সব সময় নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। কারও অবৈধ দাবি মেনে নিইনি। হয়তো এ কারণেই কেউ আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। শুধু আমি নই, আমার পরিবারের সদস্যরাও এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আমি চাই, প্রশাসন দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক।”
ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। পুলিশ পার্সেলটি কীভাবে পাঠানো হয়েছে, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি কার নামে নিবন্ধিত এবং প্রেরকের পরিচয় সঠিক কিনা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি কুরিয়ার সার্ভিসের তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিমন বোস বলেন, “এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পার্সেলটি কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে, কে পাঠিয়েছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত—এসব তথ্য উদঘাটনে আমরা কাজ করছি। প্রযুক্তিগত সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে এভাবে কাফনের কাপড় ও হুমকির চিরকুট পাঠানো শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি সরকারি দায়িত্ব পালনে ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত। তারা ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে ঘটনার পর পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকির ঘটনা বাড়ছে। তাই এ ধরনের ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সরকারি কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করার সাহস না পায়।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও তার পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
Daily Bangladesh Patrika