
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় নদী, জলাশয় ও তিন ফসলি কৃষিজমি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একদিকে চলছে অপরিকল্পিতভাবে নিচু এলাকা ও জলাশয় ভরাট, অন্যদিকে শক্তিশালী ড্রেজার ও পাইপলাইন ব্যবহার করে নদী এবং আশপাশের এলাকা থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে নদীভাঙনের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বালু উত্তোলন এবং জমি ভরাটের কার্যক্রম চলছে। সম্প্রতি নতুন করে বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার ও সেলু মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু তোলার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ভেকু বা এক্সকাভেটর ব্যবহার করে কৃষিজমির ওপরের উর্বর মাটি কেটে অন্যত্র নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এসব কার্যক্রমের ফলে আশপাশের জমির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় জমি নিচু হয়ে ধসে পড়ছে এবং সেচ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। এতে বোরো ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অনেক জমি স্থায়ীভাবে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। বর্ষা মৌসুমে এর প্রভাব আরও প্রকট হয়ে নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এতে নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও হুমকির মধ্যে পড়ে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আগে যেসব এলাকায় নিয়মিত চাষাবাদ হতো, সেখানে এখন বালুর স্তূপ দেখা যাচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে জমি আবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে শুধু কৃষিজমিই নয়, গ্রামীণ সড়ক ও আশপাশের অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকদের দাবি, কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন, নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন এবং জলাশয় ভরাটের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে নদী ও কৃষিজমি উভয়ই রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন ফসলি জমি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমির ওপরের উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হলে সেই জমির উৎপাদনশীলতা পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগে। একই সঙ্গে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যাও বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়রা আরও জানান, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কৃষিজমি কিংবা নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রভাবশালীরা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ পরিবেশ ও জীবিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় কৃষক, পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি এবং বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন ও অপরিকল্পিত ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত নদী ও কৃষিজমি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। তাদের বিশ্বাস, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজিতপুরের নদী, পরিবেশ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
Daily Bangladesh Patrika