
সাধন সাহা জয়
স্টাফ রিপোর্টার
উপমহাদেশের রাগসংগীতের প্রবাদপুরুষ, সরোদশিল্পী, বহু বাদ্যযন্ত্রের অনন্য সাধক ও বিশ্বখ্যাত সুরস্রষ্টা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি সংগীতসাধক।
১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে প্রায় ১১০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী আলাউদ্দিন খাঁ পরবর্তীতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
সরোদকে তাঁর প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি সেতার, বাঁশি, বেহালা, সানাইসহ দেশি-বিদেশি বহু বাদ্যযন্ত্রে তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। শিবপুর ইউনিয়নের সরকারি তথ্যেও তাঁকে উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী ও সরোদবিশারদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর সংগীতসাধনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপমহাদেশে। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ওস্তাদ আলী আকবর খান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, অন্নপূর্ণা দেবী, পান্নালাল ঘোষ ও পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু খ্যাতিমান শিল্পী পরবর্তীতে বিশ্বসংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
নবীনগর উপজেলার সরকারি তথ্যেও শিবপুরকে উপমহাদেশের সংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এখানে জন্ম নিয়েছেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁসহ আরও অনেক সংগীতসাধক।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর জীবন ও সাধনা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বিশ্বখ্যাত এই সংগীতসাধকের জন্মভূমি শিবপুরে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় স্থায়ী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁর পৈতৃক ভিটাসহ বিভিন্ন স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের।
এদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাহিদা সুলতানা শিবপুরে সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি পরিদর্শন করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিদর্শনের পর জন্মভূমিকে ঘিরে স্মৃতি জাদুঘর, কালচারাল সেন্টার, দর্শনার্থীদের অতিথিশালা এবং স্মারক সংরক্ষণসহ একটি সমন্বিত পরিকল্পনা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, শিবপুরে দ্রুত সুরসম্রাটের নামে একটি স্মৃতি জাদুঘর, সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। পাশাপাশি তাঁর হাতে গড়া মসজিদ ও পুকুর সংস্কার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, “সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে শিবপুরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীকে নবীনগরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং তিনি সম্মতি দিয়েছেন।
আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে।”
সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রেজাউল কবির বলেন, “সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ ও তাঁর জন্মভূমিতে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি সরকারি করার দাবি জানাই।”
ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবুল ফয়েজ, উপজেলা যুবদল নেতা মনজুরুল আলম মজনু, আলাউদ্দিন খাঁ মসজিদের প্রধান খতিব মাওলানা মোখলেসুর রহমান এবং সুরসম্রাটের দৌহিত্র লাখো খাঁর ছেলে রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয়রা বলেন, “সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শুধু শিবপুরের নন, তিনি বাঙালি ও উপমহাদেশের গর্ব।
তাঁর জন্মভূমির স্মৃতি সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
তাঁরা শিবপুরে তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর ও সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাঁর হাতে গড়া মসজিদ ও পুকুর সংস্কার করে একটি নান্দনিক ‘আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, সুরসম্রাটের নামে শিবপুরে প্রতিষ্ঠিত সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ মহাবিদ্যালয় ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সংগীতের আকাশে যাঁর সুর আজও অনুরণিত, সেই মহান সাধকের জন্মভূমি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে শিবপুর শুধু নবীনগর বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয়, উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংগীতানুরাগীদের।
Daily Bangladesh Patrika