
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ডিউটিরত এক হাইওয়ে পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। গভীর রাতে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে একটি মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাইওয়ে পুলিশের পিকআপের ওপর উল্টে পড়লে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান কনস্টেবল পারভেজ মিয়া (৩৫)। এ ঘটনায় অপর এক পুলিশ সদস্য জাকির মিয়া আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
সোমবার (৩ আগস্ট) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ১০ মিনিটে উপজেলার দ্বাড়িয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও একটি মালবোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের এই দুর্ঘটনার সৃষ্টি করে।
নিহত কনস্টেবল পারভেজ মিয়া হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি ভৈরব হাইওয়ে থানায় কর্মরত ছিলেন এবং ঘটনার সময় সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে হাইওয়ে পুলিশের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। সহকর্মীদের কাছে তিনি দায়িত্বশীল ও কর্মনিষ্ঠ পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিশোরগঞ্জগামী কুড়া-ভূসি বোঝাই একটি ট্রাক দ্বাড়িয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যানবাহনকে পাশ দিতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভৈরব হাইওয়ে পুলিশের পিকআপের ওপর উল্টে পড়ে। ভারী ট্রাকের চাপায় পিকআপটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরে থাকা পুলিশ সদস্যরা চাপা পড়ে যান।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে খবর দেওয়া হলে কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ভৈরব ফায়ার সার্ভিস এবং কুলিয়ারচর থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ট্রাকের নিচে চাপা পড়া কনস্টেবল পারভেজ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত পুলিশ সদস্য জাকির মিয়াকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জানান, ট্রাকের অবস্থান এবং পিকআপের ওপর ভারী চাপ থাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে কিছুটা সময় লাগে। পরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে ট্রাক সরিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার কারণে মহাসড়কে সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে ট্রাকের মালামাল অপসারণ এবং দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার ইলিয়াস ভূঁইয়া বলেন, দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে নিহত পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার এবং রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ সম্পন্ন করা হয়।
ভৈরব হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুমন কুমার চৌধুরী ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহত কনস্টেবল পারভেজ মিয়ার মরদেহ বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পরপরই ট্রাকের চালক ও তার সহকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত মালবাহী ট্রাক এবং হাইওয়ে পুলিশের পিকআপ জব্দ করে থানার হেফাজতে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্তও চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের এই অংশে প্রায়ই বেপরোয়া গতিতে ভারী যানবাহন চলাচল করে। বিশেষ করে গভীর রাতে অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তারা মহাসড়কে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং ট্রাফিক আইন কার্যকরের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
ডিউটিরত অবস্থায় এক পুলিশ সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসনও নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।