
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী কালি নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নাব্যতা হারানো এই নদী পুনঃখননের সম্ভাবনা যাচাই করতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে পরিদর্শন ও প্রাথমিক কারিগরি জরিপ সম্পন্ন করেছে। নদীর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপির উদ্যোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই কালি নদী পুনরুদ্ধারের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের একটি দল নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং সম্ভাব্য খননকাজের জন্য প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন।
পরিদর্শনের সময় বিশেষজ্ঞ দল ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদীর বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন। তারা নদীর গভীরতা, প্রস্থ, পলি জমার পরিমাণ, পানির প্রবাহ, নাব্যতা সংকট এবং কোন কোন স্থানে ড্রেজিং প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেন। মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত এসব তথ্য পরবর্তীতে বিশ্লেষণ করে একটি কারিগরি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পুনঃখনন প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।
কুলিয়ারচরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কালি নদীকে আবারও সচল ও নাব্য করে তোলা। একসময় এই নদী ছিল এলাকার যোগাযোগ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পলি জমে নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক স্থানে ছোট নৌকাও চলাচল করতে হিমশিম খেতে হয়। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে সেচ ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কৃষিজমিতে সময়মতো পানি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও জলাশয়গুলোতেও পানি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। ফলে কৃষক ও জেলেদের জীবিকায়ও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
নদী পরিদর্শনের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান, কুলিয়ারচর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. শাহাদাৎ হোসেন শাহ আলম, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম আলী, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম মুছা এবং কুলিয়ারচর পৌর যুবদলের সদস্য সচিব মুখলেছুর রহমান মঞ্জু।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কালি নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি কুলিয়ারচরের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নদীটি পুনরুদ্ধার করা গেলে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যারও স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সুপারিশ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। সরকারি অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে কালি নদীর পুনঃখনন বা ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা শুধু যোগাযোগ বা কৃষির জন্যই নয়, বরং একটি অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হলে জলাবদ্ধতা কমবে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ সহজ হবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশও ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হবে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞ দলের এই মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কুলিয়ারচরের সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কালি নদীর হারানো নাব্যতা ফিরিয়ে এনে কুলিয়ারচরের কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে—এমন আশাই করছেন এলাকাবাসী।