পীরগঞ্জে আত্মহত্যার প্রবণতা,নীরবে বাড়ছে সামাজিক সংকট?
সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
Update Time :
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৪৫
Time View
পীরগঞ্জে আত্মহত্যার প্রবণতা,নীরবে বাড়ছে সামাজিক সংকট?
সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত তিন মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে অন্তত তিনটি আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে একই দিনে উপজেলার দুটি ঘটনায় দুই নারীর মৃত্যু এবং সেপ্টেম্বরে পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি কোনো সরকারি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়; সংবাদে না আসা ঘটনা থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৭ জন বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে হাসপাতালের তথ্যের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জন নারী ও ৪০ জন পুরুষ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজনের মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ শুধু আত্মহত্যার চূড়ান্ত ঘটনা নয়, আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মঘাতী আচরণও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেও সমস্যাটির বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়। ৭ জুলাই পীরগঞ্জের চাপোড় এলাকায় ৬৩ বছর বয়সী মেহেরুন নেছার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভোগার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। একই দিনে সিঙ্গারোল এলাকায় পারিবারিক কলহের পর বিষপান করা ১৮ বছর বয়সী মোনালিসা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৯ সেপ্টেম্বর সেনগাঁও ইউনিয়নের সিন্দুন্যা এলাকায় এক রাজমিস্ত্রির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্তের কথা জানিয়েছে। সবশেষে ১৮ সেপ্টেম্বর ভোমরাদহ ইউনিয়নের সেনুয়া গ্রামে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও পুলিশ জানিয়েছে, এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। পীরগঞ্জের আইনজীবী আবু সায়েম মনে করেন, মাদক, অনলাইন জুয়া, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অপমান ও বৈবাহিক সংকট মানুষের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, এসব সংকটকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; সামাজিক পর্যায়ে এর কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ ও মাদকাসক্তিকে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবারে সন্তান বা স্বজনের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে কথা বলা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি। পীরগঞ্জে আত্মহত্যার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মৃত্যুর হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তা, মাদক, অনলাইন জুয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল সামাজিক সংকেত। নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ, ইউনিয়নভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা গেলে সমস্যাটিকে আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
83
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত তিন মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে অন্তত তিনটি আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে একই দিনে উপজেলার দুটি ঘটনায় দুই নারীর মৃত্যু এবং সেপ্টেম্বরে পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি কোনো সরকারি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়; সংবাদে না আসা ঘটনা থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৭ জন বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে হাসপাতালের তথ্যের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জন নারী ও ৪০ জন পুরুষ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজনের মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ শুধু আত্মহত্যার চূড়ান্ত ঘটনা নয়, আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মঘাতী আচরণও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেও সমস্যাটির বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়। ৭ জুলাই পীরগঞ্জের চাপোড় এলাকায় ৬৩ বছর বয়সী মেহেরুন নেছার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভোগার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। একই দিনে সিঙ্গারোল এলাকায় পারিবারিক কলহের পর বিষপান করা ১৮ বছর বয়সী মোনালিসা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
৯ সেপ্টেম্বর সেনগাঁও ইউনিয়নের সিন্দুন্যা এলাকায় এক রাজমিস্ত্রির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্তের কথা জানিয়েছে।
সবশেষে ১৮ সেপ্টেম্বর ভোমরাদহ ইউনিয়নের সেনুয়া গ্রামে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও পুলিশ জানিয়েছে, এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
পীরগঞ্জের আইনজীবী আবু সায়েম মনে করেন, মাদক, অনলাইন জুয়া, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অপমান ও বৈবাহিক সংকট মানুষের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, এসব সংকটকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; সামাজিক পর্যায়ে এর কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ ও মাদকাসক্তিকে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবারে সন্তান বা স্বজনের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে কথা বলা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
পীরগঞ্জে আত্মহত্যার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মৃত্যুর হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তা, মাদক, অনলাইন জুয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল সামাজিক সংকেত। নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ, ইউনিয়নভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা গেলে সমস্যাটিকে আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।