
ইকরামুল হক বিশেষ প্রতিনিধি
কক্সবাজার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর সামুদ্রিক বৈচিত্র্যের জনপদ কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন আজ এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ও সিন্ডিকেট চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধভাবে ঝিনুক উত্তোলন এবং নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব। আইনের কঠোর বিধান ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও থেমে নেই এই ধ্বংসযজ্ঞ। এর ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি টাকার সরকারি ঝাউবাগান, অনন্য জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য।
অবৈধ ঝিনুক উত্তোলনের স্পট ও মূল হোতারা
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাহারছড়া ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা, বড় ডেল, কচ্ছপিয়া, নোয়াখালীপাড়া এবং জাহাজপুরা এলাকার বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একটি শক্তিশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবাধে ঝিনুক ও বালি সংগ্রহ করে আসছে। স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য অনুযায়ী, কচ্ছপিয়া এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা চিহ্নিত ব্যক্তি ইলিয়াস কচ্ছপিয়া এই অবৈধ ঝিনুক উত্তোলনের মূল গডফাদার। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবপাচার ও মাদক ব্যবসাসহ একাধিক গুরুতর অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। এই চক্রটি প্রতিদিন শত শত শ্রমিক ব্যবহার করে সৈকত থেকে ঝিনুক তুলে বস্তাবন্দি করছে এবং তা চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন বাণিজ্য কেন্দ্রে পাচার ও চড়া মূল্যে বিক্রি করছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে উপকূলীয় জনপদ
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এভাবে প্রতিদিন নির্বিচারে ঝিনুক ও বালি উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা পাহাড়ের পাদদেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঝিনুক হলো সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের এক অপরিহার্য উপাদান, যা সৈকত রক্ষা এবং সমুদ্রের ভাঙন রোধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, রাতের আঁধারে বাগানের গাছ কেটে সাবাড় করায় অদূর ভবিষ্যতে এই পাহাড়, জঙ্গল ও উপকূলীয় ঝাউবাগান সাগরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায়, প্রলয়ংকরী ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির হাত থেকে জনপদকে বাঁচাতে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে লাখ লাখ ঝাউগাছ রোপণ করেছিল। এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের সুপারি বাগান, ফসলি জমি ও বসতভিটার সুরক্ষায় এই উপকূলীয় বনাঞ্চল একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে কাজ করে আসছে। অথচ একশ্রেণির অসাধু মানুষের লোভের বলি হচ্ছে এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উদাসীনতা ও দুর্নীতির অভিযোগ
এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন—সরকার যেখানে উপকূলের সুরক্ষায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধ্বংসের মুখে থাকা এই সংবেদনশীল এলাকাগুলো মূলত বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের আওতাধীন মৌলভী পাড়া বিট এবং জাহাজপুরা বিটের নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে স্থানীয় এলাকাবাসীর জোরালো অভিযোগ, হোয়াইক্যং রেঞ্জ কর্মকর্তা জনাব তিতুমীর, শামলাপুর বিট কর্মকর্তা জনাব ফুয়াদ, মনখালী বিট কর্মকর্তা জনাব শুভ এবং হোয়াইক্যং বিট কর্মকর্তা জনাব কামরুজ্জামান শুভর চরম অবহেলা, পেশাগত উদাসীনতা ও প্রত্যক্ষ মদদের ফলেই আজ পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে এবং ঝাউবাগান ধ্বংস করা হচ্ছে।
শামলাপুর ভিসিজি (VCG) ও ভিসিএফ (VCF) সভাপতি, বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী এবং WERT-এর সদস্য জনাব আমীরসহ স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, বন বিভাগের এই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরকারি দায়িত্ব পালনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো অসাধু চক্রের সাথে আক্ষরিক অর্থেই হাত মিলিয়েছেন। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তারা এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যার ফলে অপরাধী চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।
এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের দাবি
প্রকৃতির ওপর এই নিষ্ঠুর আগ্রাসন রোধে এবং পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. সৈকত থেকে অবৈধ ঝিনুক উত্তোলন ও পাচার চিরতরে বন্ধ করা।
২. পাহাড় কাটা ও ঝাউবাগান ধ্বংসের সাথে জড়িত গডফাদার ইলিয়াস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. বন বিভাগের নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করে উপকূলীয় ঝাউবাগান ও পাহাড় রক্ষায় দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ।
পরিবেশবাদীদের মতে, এখনই যদি এই বেপরোয়া চক্রের হাত থেকে বাহারছড়ার পাহাড় ও ঝাউবাগান রক্ষা করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে টেকনাফের এই উপকূলীয় জনপদ এক অপূরণীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়বে।