
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন জুনায়েদ আহমেদ (২০) নামের এক সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলার। জীবিকার তাগিদে ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করার পাশাপাশি ফুটবল মাঠে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পাওয়া এই তরুণের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, বন্ধু, সতীর্থ ও স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে নরসিংদীর বেলাব উপজেলার পোড়াদিয়া এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত জুনায়েদ কুলিয়ারচর পৌরশহরের কামালিয়াকান্দি মহল্লার বাসিন্দা ফালু মিয়ার ছেলে। পেশাগত জীবনে ইলেক্ট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করলেও ফুটবল ছিল তাঁর অন্যতম ভালোবাসা। স্থানীয় ‘বাজরা ব্রাদার্স ফুটবল একাদশ’-এর অধিনায়ক হিসেবে তিনি সতীর্থদের নেতৃত্ব দিতেন। মাঠে তাঁর উপস্থিতি ও নেতৃত্ব তাঁকে স্থানীয় তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল।
পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন জুনায়েদ। বৃহস্পতিবার জ্বর কিছুটা কমে এলেও সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ তাঁর মাথা ঘুরতে শুরু করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত তাঁকে কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।
জুনায়েদের মৃত্যুর খবরে তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে শোকাহত হয়ে পড়েছেন তাঁর ফুটবল দলের সতীর্থ ও স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা। তাঁদের কাছে জুনায়েদ শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন দলের অধিনায়ক ও মাঠের একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
সতীর্থদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডুমরাকান্দায় আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে জুনায়েদের নেতৃত্বেই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দল। অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন খেলোয়াড়েরা। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিণতিতে সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর মাঠে নামা হলো না জুনায়েদের। তাঁর অনুপস্থিতি দলের খেলোয়াড়দের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা হয়ে থাকবে।
মাত্র ২০ বছর বয়সে জীবনের নানা দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন জুনায়েদ। একদিকে জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম, অন্যদিকে মাঠে নিজের দক্ষতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল পরিশ্রম ও সম্ভাবনায় ভরা। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অকালে তাঁর চলে যাওয়ায় থেমে গেল সেই স্বপ্নের পথচলা।
জুনায়েদের মৃত্যু আবারও ডেঙ্গু জ্বরের ঝুঁকি ও সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জ্বরের সঙ্গে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পেটব্যথা, বারবার বমি কিংবা অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
কুলিয়ারচরের ফুটবল অঙ্গনে জুনায়েদের স্মৃতি এখন তাঁর নেতৃত্ব, খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। যে তরুণকে ঘিরে সতীর্থদের ছিল ফাইনালে জয়ের প্রত্যাশা, তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই আনন্দের মুহূর্তই পরিণত হয়েছে গভীর বেদনার স্মৃতিতে।