
মালিকুজ্জামান কাকা
ঝিনাইদহের মহেশপুরের মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাতটি মৌজা যশোরের চৌগাছা উপজেলায় অন্তর্ভুক্তির গেজেট এসেছে। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘ চার দশকের প্রশাসনিক সীমানা বিরোধের স্থায়ী সমাধান ও সাতটি মৌজা মহেশপুর উপজেলায় বহাল রাখার দাবিতে এই কর্মসূচির আয়োজন।
মান্দারবাড়ীয়ার পুড়াপাড়া বাজারে এই মানববন্ধন হয়। ‘চৌগাছায় যেতে চাই না, মহেশপুরেই থাকতে চাই’ এই স্লোগানে মানববন্ধনে শ্যামনগর, বিশ্বনাথপুর, কমলাপুর, আলিশা, যদুনাথপুর, পাঁচবাড়িয়া ও ডাড়িপাড়া গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন। এতে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, এক স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত ও বাস্তবতা উপেক্ষা করে সাত মৌজাকে চৌগাছা উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তারা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে এসব গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা মহেশপুরের মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাই এলাকাবাসীর মতামত উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। গত সপ্তাহের এই মাবব বন্ধন জনরোষের ফল।
সাত গ্রামের কাছাকাছি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পোস্ট অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস। দীর্ঘদিন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা সেবা নেন। এসব মৌজা চৌগাছা উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত হলে সরকারি সেবা গ্রহণ ও যাতায়াতে তাদের ভোগান্তি বাড়বে। জনস্বার্থ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায় সাত মৌজা মহেশপুর উপজেলায় বহাল রাখার দাবি তাদের।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মান্দারবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান এস এম জগলুল পাশা, মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রভাষক আতিকুর জামান শিপন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক এস এম হোসেন জাফরিন পাশা, মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আমিনুল রহমান ও ফসিয়ার রহমান, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আতিয়ার রহমান এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আব্দুল আলিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এ সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা জানান, স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপানো হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, সাত মৌজার প্রশাসনিক সীমানা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘ।
১৯৮৮ সালে নিকার ৫৫তম বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। ১০ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে গ্রামগুলো মহেশপুর থেকে বিচ্ছিন্ন করে চৌগাছা উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করে। পরে স্থানীয় দাবিতে ১৯৯৪ সালের ৪ অক্টোবর নিকার-এর ৮১তম বৈঠকের সিদ্ধান্তে প্রজ্ঞাপন জারি করে মৌজাগুলো পুনরায় মহেশপুরে ফেরানো হয়।
২০০১ সালের ৯ মে নিকার ৮৬তম বৈঠকে মৌজাগুলো পুনরায় চৌগাছায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।এর বিরুদ্ধে মান্দারবাড়ীয়া ইউপির তৎকালীন চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম সর্দার হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত রুল জারিসহ স্থগিতাদেশ দেন। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করেন। তবে প্রশাসনিক সীমানা বিরোধ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
সীমানা বিরোধ নিরসনে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ চৌগাছা উপজেলা পরিষদে এবং ৩০ মার্চ মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গণশুনানি হয়। খুলনার তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আব্দুর রশিদ শুনানি করেন। এ সময় অনেক মানুষের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করা হয়।
তবে দীর্ঘ সময়েও গণশুনানির প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় সাত গ্রামের মানুষের দাবি, বিভাগীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেন দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তি করে জনমত ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সাতটি মৌজাকে স্থায়ী ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নে বহাল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।