
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
পীরগঞ্জের সমাজব্যবস্থা ও অনুশাসন আটকাতে পারছে না অপরাধকে!
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক অনুশাসন ও প্রচলিত সমাজব্যবস্থা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে এমন অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলের। মাদক, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিরোধসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল ভূমিকা না থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একসময় পীরগঞ্জের গ্রামগুলোতে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের শক্তিশালী ভূমিকা ছিল। কোনো কিশোর বা যুবক বিপথে গেলে পরিবারের পাশাপাশি এলাকার প্রবীণরাও তাকে সতর্ক করতেন। ছোটখাটো বিরোধ স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পারিবারিক দূরত্ব এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ কমে যাওয়ায় সেই সামাজিক বন্ধন অনেকটাই দুর্বল হয়েছে।
পীরগঞ্জের একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আগে একটি ছেলে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে এগুলো প্রতিবেশীরাও খেয়াল রাখতেন। এখন সবাই নিজের পরিবার নিয়েই ব্যস্ত। অন্যের সন্তান বিপথে গেলেও কেউ কিছু বলতে চান না। ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়ছে।”
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক যোগাযোগের অভাবে অনেক বাবা-মা সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে পর্যাপ্ত খোঁজখবর রাখতে পারেন না। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকের প্রতি আগ্রহ, অনলাইনভিত্তিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
একজন অভিভাবক বলেন, “শুধু পুলিশ দিয়ে অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এ বিষয়ে পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা না পেলে পরে সমাজের পক্ষে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।”
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও আইন সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত করা সম্ভব।
পীরগঞ্জের একজন শিক্ষক বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করার জায়গা নয়। শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও আমাদের দায়িত্ব। পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা ছাড়া শুধু স্কুলের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।”
স্থানীয়দের মতে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ খুব কম। অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্বার্থের কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে মানুষ ভয় পান। আবার কিছু ঘটনায় সামাজিক চাপ, আপস-মীমাংসা বা নীরবতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন স্থানীয় সামাজিক কর্মী বলেন, “অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে অপরাধীকে ছাড় দিলে সমাজে ভুল বার্তা যায়। অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান শক্ত করতে হবে।”
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, অভিভাবক ও তরুণ সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, মাদকবিরোধী প্রচারণা, কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সন্দেহজনক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি বলে তারা মনে করেন।
পীরগঞ্জের একজন তরুণ বলেন, “তরুণদের শুধু দোষারোপ করলে হবে না। তাদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ইতিবাচক কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সমাজ যদি ভালো পথ দেখায়, তাহলে অনেকেই বিপথে যাওয়া থেকে ফিরে আসবে।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি শক্তিশালী সামাজিক অনুশাসনও প্রয়োজন। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীল না হলে শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়।
পীরগঞ্জে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। নৈতিক শিক্ষার চর্চা, পারিবারিক নজরদারি, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমানো সম্ভব। নীরবতা নয়, দায়িত্বশীল সামাজিক প্রতিরোধই হতে পারে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পীরগঞ্জ গড়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।