1. mdrouf834@gmail.com : দৈনিকবাংলাদেশপত্রিকা :
  2. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
Title :
বোচাগঞ্জে ভিয়েতনামি কালো ধানে কপাল খুলেছে রকিবুলের। পুলিশের কাজে বাধা দিলেন নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ জিসানের মায়ের আহাজারিতে চকরিয়ার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে আমিরাবাদ ইউনিয়নের কল্যাণে প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীরের অবদান নওগাঁর পোরশায় পুনর্ভবার তাজা মাছে জমে উঠেছে নিতপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছ বাজার। নওগাঁর পোরশায় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভা। ব্যাচমেট আশরাফের অকাল প্রয়াণ: ফেসবুকে ঢাকা জেলা প্রশাসকের আবেগঘন বার্তা মাদক, সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ওসি আরিফ ফয়সালের অভিযান সিরাজদিখানে ধলেশ্বরীর নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শনে এমপি আব্দুল্লাহ্ঃ মিঠামইনে পাচারের পথে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ২

ভোর হতে না হতেই কক্সবাজারে জেগে ওঠে সিএনজি, সাথে সাথে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ Time View
30

কামরুল০১৮৮৩০৮৮০৮৪

শহর। বাস টার্মিনাল, লিংক রোড, লালদিঘীর পাড়, খুরুশকুল রাস্তার মোড়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যায় নীল-সবুজ রঙের সিএনজি অটোরিকশা। যাত্রী ওঠানামার এই চেনা দৃশ্যের আড়ালে প্রতিদিন ঘটে যায় আরেকটি লেনদেন, যার হিসাব রাখা হয় খাতা-কলমে নয়, মুখে মুখে চুক্তিতে। মাস শেষে একেকটি গাড়ির চালক বা মালিককে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘টোকেন’ টাকা। কাউকে এক হাজার, কাউকে দুই হাজার। বিনিময়ে মেলে সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের অলিখিত অনুমতি, লাইসেন্স থাকুক বা না থাকুক।
কক্সবাজারের সড়কে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, জড়িত ট্রাফিক পুলিশের একাংশ
শুধু শহর নয়, এই চাঁদাবাজির জাল ছড়িয়ে আছে টেকনাফ থেকে ঈদগাঁও, রামু থেকে কলাতলী পর্যন্ত পুরো জেলাজুড়ে।
কক্সবাজারের সড়কে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, জড়িত ট্রাফিক পুলিশের একাংশ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কক্সবাজার জেলাজুড়ে সিএনজি অটোরিকশা, ডাম্পার, বাস, রেন্ট-এ-বাইক, টমটম-মিশুকসহ প্রায় সব ধরনের পরিবহনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত টোকেন বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক। বিচ্ছিন্ন হিসাবগুলো একসঙ্গে মেলালে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে এই খাত থেকে উঠে আসছে কয়েক কোটি টাকা। আর এই বিশাল অঙ্কের নিয়ন্ত্রণ রেখা গিয়ে ঠেকেছে ট্রাফিক পুলিশের একাংশের হাতে।
কক্সবাজারের সড়কে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, জড়িত ট্রাফিক পুলিশের একাংশ
সূত্র বলছে, বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে সংগৃহীত চাঁদার টাকা প্রথমে পৌঁছায় নির্দিষ্ট কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের হাতে, এরপর তা বুঝিয়ে দেওয়া হয় ট্রাফিক ইনচার্জ (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজকে। অভিযোগ অনুযায়ী তিনিই এই টাকা জুনিয়র সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেন, একটি অংশ পৌঁছায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও।
এই চাঁদাবাজি হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলার অন্তত ১০টি স্টেশনকে ঘিরে সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট। বৈধ প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসে প্রায় ১ হাজার টাকা, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি থেকে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। জেলায় অন্তত প্রায় ১০ হাজার অবৈধ সিএনজির হিসাবে শুধু এই খাত থেকেই মাসে ওঠে প্রায় কোটি টাকা। শুধু নিউটনের ‘কোম্পানি’ সিন্ডিকেট থেকেই মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে।
টেকনাফ-শামলাপুর বিলকিস মার্কেট-সংলগ্ন স্ট্যান্ড থেকে প্রতি সিএনজি ১৮০০ টাকা করে আদায় হয়, নিয়ন্ত্রণে আমানুল্লাহ, টাকা তোলেন আনোয়ার। আমানুল্লাহর অধীনে খরুলিয়া, লিংক রোড ও রামু মিলিয়ে প্রায় সহস্রাধিক সিএনজি, নিজেকে পরিচয় দেন সিএনজি সংগঠনের নেতা হিসেবে। হাইওয়ে পুলিশের জন্য তিনি নেন আরও ৫০০ টাকা করে।
রামু সিএনজি সমিতির সভাপতি পরিচয়ে মমতাজ এবং সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে ভুট্টো। তাদের অধীনে প্রায় সহস্রাধিক সিএনজি, প্রতিটি থেকে মাসে ১৮০০ টাকা করে ট্রাফিক পুলিশের নামে আদায় হয়।
ঈদগাঁওয়ের দায়িত্বে আজিম, হাজারখানেক সিএনজি থেকে ১৮০০ টাকা করে তোলেন তিনি।
রামু শাখার সিএনজি সমিতির সভাপতি পরিচয় দেওয়া মমতাজের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। ১৮০০ টাকা করে চাঁদা তোলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, ‘যারা অভিযোগ করছে তাদের নিয়ে আমার সামনে আসুন।’ তার দাবি, রামু-গর্জনিয়া, মরিচ্যা ও কক্সবাজার লাইন তার অধীনে রয়েছে, এবং প্রতিদিন ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। মমতাজের ভাষ্য, এই টাকা শুধু চাঁদা নয়- কোনো চালক দুর্ঘটনায় পড়লে তাকে ২০ হাজার টাকা সহযোগিতাও করা হয় এই তহবিল থেকে।
বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০২১ সালে জেলায় প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি অবৈধ সিএনজি ছিল, প্রতিবছর যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৫০০টি করে- ৫ বছরে যোগ হয়েছে প্রায় ২৫০০টি। রক্ষণশীল হিসাবে হাজারখানেক গাড়ি থেকেও মাসে ১৮০০ টাকা করে নিলে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যার বড় অংশ যায় হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের পকেটে।
লিংক রোড এলাকায় নিয়মিত অবস্থান করে প্রতি ডাম্পার থেকে ১৫০০ টাকা করে তোলেন জাহাঙ্গীর। এ ছাড়া শহরের প্রায় দুই হাজার অবৈধ ডাম্পার থেকে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়, যার বড় অংশ পৌঁছায় খসরু পারভেজের কাছে।
পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনাম ব্যবহার করে ফোনে কথা হয় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। কথার শুরুতেই তিনি অভয় দিয়ে বলেন, গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিলে লাইন খরচ বা নির্বিঘ্নে চলাচল নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সে দায়িত্ব আমার। তিনি বলেন, আপনি আগে গাড়ি কেনেন, লাইন খরচ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য চিন্তা করতে হবে না। আমার সঙ্গে এসে দেখা করিয়েন।
সূত্রের দাবি, কলাতলীর প্রায় ২০০টি অবৈধ রেন্ট-এ-বাইক থেকে ১ লাখ টাকা তোলেন দরিয়ানগরের আবছার ও কলাতলীর লাকী। দূরপাল্লার বাস থেকে মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা, চান্দের গাড়ি থেকে ৫০ হাজার, কলাতলী কার লাইন থেকে ৫০ হাজার এবং মিনিবাস থেকে ৫০ হাজার টাকা করে আদায় হয়। শহরের অলিগলি-মোড়ে চলা প্রায় হাজারখানেক অনুমোদনহীন টমটম-মিশুক থেকেও নিয়মিত মাসোহারা তোলা হয়।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত হিসাবে, শুধু শহরের ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। জেলার হাইওয়ে-উপশহর মিলিয়ে সব খাত যোগ করলে অঙ্কটা দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকায়। একটি জেলার সড়ক অর্থনীতিতে সমান্তরালভাবে চলা এক ‘কর ব্যবস্থা’, যার প্রাপক রাষ্ট্র নয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নাম, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কোম্পানি’। দেবানল পাল ওরফে নিউটন নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় দুই হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা। মাঠপর্যায়ে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন শাহাবুদ্দিন, শাহাজাহান, শহিদুল্লাহ, ভূট্টো, আমান উল্লাহ, মমতাজ, ছালামতসহ আরও কয়েকজন। জেলার সড়কজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভুট্টো ও মমতাজের নাম বারবার ফিরে আসে। শহরের রুট নিয়ন্ত্রণে যেমন, রামুর সিএনজি সমিতির নেতৃত্বেও তেমন, যা বুঝিয়ে দেয় কতটা বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের বিস্তার।
জেলার প্রধান সড়কগুলোও ভাগ হয়ে গেছে প্রভাবশালী কয়েকটি চক্রের মধ্যে। বাস টার্মিনাল থেকে রামু পর্যন্ত রুট নিয়ন্ত্রণ করেন শাহজাহান, যার অধীনে প্রায় এক হাজার অবৈধ সিএনজি। লিংক রোড হয়ে মরিচ্যা, কোর্টবাজার ও উখিয়া পর্যন্ত রুট চালান শহিদুল, যার ‘এ প্লাস’ সিন্ডিকেটের আওতায় ৮০০ থেকে ৯০০ সিএনজি। কক্সবাজার-চকরিয়া রুট নিয়ন্ত্রণ করেন ভুট্টো, আমান উল্লাহ ও মমতাজ, তাদের অধীনে আরও প্রায় এক হাজার গাড়ি। আর টেকনাফ-শামলাপুর করিডোরে আমানুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে খরুলিয়া-লিংক রোড-রামু মিলিয়ে আরও সহস্রাধিক গাড়ি- অর্থাৎ শহর থেকে দূরবর্তী উপজেলা পর্যন্ত একই কাঠামোর পুনরাবৃত্তি।
দেবানল পাল ওরফে নিউটনের সঙ্গে কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা টাকা নিই। সব টাকা তো আমরা নিই না। ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিত টিআই, টিএসআই, সার্জেন্টসহ অন্তত ২০ জন পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়।’
তার দাবি, অবৈধ গাড়ি শহরে ঢুকলে ট্রাফিক পুলিশ আটক করে, তাই আগেই টাকা দিয়ে রাখতে হয়। নিউটনের ভাষ্য, বাহারছড়া এলাকার শাহাজান তার নিয়ন্ত্রিত টাকার ভাগে বসেছেন এবং নিজেও একটি লাইন পরিচালনা করছেন, তবে পুলিশ সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব তারই বলে দাবি করেন নিউটন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে পুরো ট্রাফিক বিভাগকে ম্যানেজ করতে মাসে এককালীন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দিতে হতো; বর্তমানে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সরাসরি মাসিক টাকা দিতে হয়- টিআইদের ৩০ হাজার, সার্জেন্ট ও টিএসআইদের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে, সব মিলিয়ে মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কোটি টাকার হিসাবের আড়ালে প্রতিদিন হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকা মানুষগুলোর কণ্ঠেও ফুটে ওঠে এই বাস্তবতার ভার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চালক বলেন, কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও মাসিক চুক্তি না করলে রেহাই নেই। তার ভাষ্যে, ট্রাফিক পুলিশ, বিশেষ করে খসরু স্যার, অহেতুক নানা অজুহাত দেখিয়ে হয়রানি করেন, শেষ পর্যন্ত গুনতে হয় মামলার জরিমানা।
সরেজমিনে দেখা যায় এই বৈষম্যের আরও স্পষ্ট চিত্র। নম্বরবিহীন ডাম্পার, সিএনজি, মিশুক গাড়ি লাগামহীনভাবে সড়কে চলছে, ট্রাফিক পুলিশ কিংবা হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই বীরদর্পে। এসব গাড়ির কোনোটিকে দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র চেক করতে দেখা যায়নি। অথচ দূরের কোথাও থেকে অপরিচিত কোনো গাড়ি এলাকায় ঢুকলেই তার কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখা হয়, ধরিয়ে দেওয়া হয় মামলা। স্থানীয় ‘লাইনের’ আওতাভুক্ত না হওয়াই যেন এখানে আসল অপরাধ।
চাঁদার এই বলয় থেকে বাদ যায়নি দূরপাল্লার বাসও। কলাতলী জেলগেট সড়কের দুই পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বিভিন্ন কোম্পানির বাস। জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলেন, তাদের গাড়ি রাখার জন্য কয়েকটি ডিপো রয়েছে, তবু গাড়ির সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে সড়কের দুই পাশে রাখতে হয়। আর তখনই ‘স্যারদের চা খরচ’ হিসেবে টাকা গুনতে হয় তাদের- না দিলে জোটে নানা ধরনের হয়রানি কিংবা মামলা।
সকাল সাড়ে সাতটা। লিংকরোডের কোণে বসে গাড়ি মোছেন আলী আকবর। দুটি সিএনজি তার। একটা পরিবারের খরচ চালায়, বাকি একটা ভাড়ায় খাটে। কিন্তু দুটো গাড়ির প্রতিটির জন্যই মাস গেলে টাকা বরাদ্দ রাখতে হয় ‘কোম্পানি’র নামে। সেদিন বাস টার্মিনালের সামনে হঠাৎ থেমে যায় তার একটা গাড়ি। টিআই খসরুর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটাই কথা বলেন- ‘কোম্পানির গাড়ি।’ ব্যস, আর কোনো প্রশ্ন নেই। গাড়ি ছাড়া পায় মুহূর্তেই।
খুরুশকুলের ফরিদের গল্পটা অন্যরকম। একসময় শাহজাহানের অধীনে গাড়ি চালাতেন, এখন চালান পুলিশের একজনের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়ায়। প্রতি মাসের ১ হাজার ৮০০ টাকা তার হিসাবের খাতায় আগে থেকেই বসানো থাকে- যেন বেতনের মতোই বাঁধা এক খরচ। ‘এটাই তো লাইসেন্স’ যদিও তিনি জানেন কাগজে-কলমে এর কোনো ভিত্তি নেই।
মনজুরের কণ্ঠে তবু জমে আছে এক ধরনের ক্ষোভ। বছরের পর বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এক টুকরো স্বনির্ভরতার আশায়, কিনেছিলেন নিজের সিএনজি। কিন্তু সড়কে নেমে বুঝলেন হিসাবটা তার জানা নিয়মে মেলে না। তার গাড়ি প্রায়ই আটকায়, অথচ পাশ দিয়ে অন্য গাড়ি নির্বিঘ্নে চলে যায়। খোঁজ নিয়ে জানলেন, আসল অনুমতিপত্র কাগজে নেই, আছে মাসিক লাইন খরচের রসিদে।
লালদিঘীর পাড়ের প্যানোয়া সড়কে চিত্রটা আরও করুণ। সত্তরটা সিএনজির লাইনে চল্লিশটারই লাইসেন্স নেই, তবু বাহারছড়া-শাপলাপুর রুটে এসআই জসিমের নামে চলে তাদের গাড়ি, মাসে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে- এতটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে ব্যবস্থাটা যে এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলে না। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জসিম এক সময় কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে খাগড়াছড়িতে কর্মরত, তবু তার নামেই চলে এই লাইনের নিয়ন্ত্রণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চালকের অভিজ্ঞতা আরও তেঁতো। একবার কাগজপত্র দেখাতে সামান্য দেরি হওয়ায় খসরু পারভেজ তাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেন বলে অভিযোগ তার। আরেকজন জানান, কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও মাসিক চুক্তি না থাকলে নানা অজুহাতে হয়রানি আর মামলা নিশ্চিত।
লিংক রোডের ডাম্পার চালকদের গল্পও এর বাইরে নয়। জাহাঙ্গীর নামের একজন নিয়মিত এলাকায় ঘুরে প্রতি ডাম্পার থেকে দেড় হাজার টাকা তুলে নেন। জেলাজুড়ে প্রায় দুই হাজার অবৈধ ডাম্পার থেকে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে ওঠা এই অর্থের বড় অংশ শেষমেশ গিয়ে জমা হয় খসরু পারভেজের হিসাবে।
এই চালকদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু সুর একটাই- চাঁদা এখানে ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম। প্রতিবাদের পথ নেই, কারণ প্রতিবাদ মানেই গাড়ি বন্ধ, আর গাড়ি বন্ধ মানেই সংসার বন্ধ।
শুধু মাসিক চুক্তি নয়, শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিনও চলে টাকা তোলার কার্যক্রম। একেকজন চালক গাড়ি থেকে নেমে লাইনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে গিয়ে কারও কাছ থেকে ২০ টাকা, কারও কাছ থেকে ৪০ টাকা দেন, তারপর মেলে সিরিয়াল। রাত বাড়লেও কমে না এই ব্যস্ততা, চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৪০ টাকা নেওয়া হয়- ২০ টাকা ‘লাইন খরচ’ আর ২০ টাকা পৌরসভার খরচ হিসেবে। এই টাকা সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত মোহাম্মদ বেলাল নামের এক লাইনম্যান। টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বেলাল বলেন, ‘এটি লাইন খরচের টাকা। গাড়িগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সিরিয়াল দিয়ে ২০ টাকা করে নিচ্ছি।’ এই ব্যবস্থার সরকারি অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে করছি। চলতে হবে তো।’
অনুসন্ধানে টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে সার্জেন্ট মাঈন উদ্দিন, সার্জেন্ট রোবায়েত, টিআই অ্যাডমিন খসরু পারভেজ এবং রেকার চালক সুকর্ণ দাশের বিরুদ্ধে। জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেন। খসরু পারভেজ দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, ‘মাসোহারার বিষয়ে যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকে, নিউজ করে দেন।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টিআই খসরুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ শুনেছি। কক্সবাজারে প্রায় হাজার খানেক অবৈধ ডাম্পার চলে, কিন্তু একটি ডাম্পারও কখনো জরিমানা কিংবা জব্দ করতে দেখিনি।’ তিনি দ্রুত খসরু পারভেজকে কক্সবাজার থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমি সিরিয়াসলি দেখছি এবং এসপি স্যারের সাথেও বিষয়টি শেয়ার করছি।’
লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে সড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। শহর থেকে টেকনাফ, রামু থেকে ঈদগাঁও- জেলার প্রতিটি প্রান্তে ছোট ছোট অঙ্কের চাঁদা মিলেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কয়েক কোটি টাকার এক সমান্তরাল অর্থনীতি, যার নিয়ন্ত্রণ রেখা বারবার গিয়ে ঠেকছে একই জায়গায়। তিন চালকের ভাষ্যে অভিন্ন একটি সুর ফুটে ওঠে- চাঁদার টাকা তাদের কাছে নতুন কিছু নয়, বরং সড়কে গাড়ি চালানোর অলিখিত পূর্বশর্ত। প্রতিবাদের সুযোগ নেই, কারণ প্রতিবাদ মানেই গাড়ি বন্ধ, রুটি-রুজি বন্ধ। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2026