
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বৃক্ষরোপণের অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের ৩৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলজ বৃক্ষের চারা বিতরণ করা হয়েছে। সামাজিক ও পরিবেশভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জামান ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শতাধিক শিক্ষার্থীর হাতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— “লাগাবো বৃক্ষ, নির্মল হবে পরিবেশ, গড়বো সবুজ বাংলাদেশ।” আয়োজকদের মতে, শুধু গাছ লাগানোই নয়, প্রতিটি চারা বড় করে তোলার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ছয়সূতী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাহউদ্দিন মুর্শেদ নিজামী (বাবুল)। এছাড়া বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠান পরিচালনায় সহযোগিতা করেন ৩৩ নম্বর হাজারীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তুলতে এমন উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম এ হান্নান বলেন, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, খরা, নদীভাঙন এবং পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি গাছ শুধু অক্সিজেন সরবরাহ করে না; এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ছায়া প্রদান, ফল উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত অন্তত একটি গাছ রোপণ করে সেটির নিয়মিত পরিচর্যা করা।
আয়োজক জামান বলেন, মানুষের প্রকৃত বন্ধু হলো গাছ। একটি গাছ কয়েক দশক ধরে মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণে কাজ করে যায়। তাই জন্মদিন, জাতীয় দিবস কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি গাছ রোপণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “আজ তোমাদের হাতে যে ছোট্ট চারাগাছ তুলে দেওয়া হয়েছে, কয়েক বছর পর সেটিই বড় হয়ে অসংখ্য মানুষকে ফল, ছায়া ও নির্মল বাতাস দেবে। তাই শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেটিকে যত্ন করে বড় করে তোলার দায়িত্বও তোমাদের নিতে হবে।
আয়োজক জামান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশগত সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বনভূমি কমে যাওয়া, বায়ুদূষণ বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলো মানুষের জীবনযাত্রাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সংগঠনটির প্রতিনিধিরা বলেন, ফলজ গাছ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ফলজ গাছ একদিকে যেমন কার্বন শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, অন্যদিকে পরিবারের খাদ্য ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণেও সহায়তা করে। সেই লক্ষ্য থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষকরা বলেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে না। পরিবেশ, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তারা আরও বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পরিবার ও সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। চারা হাতে পেয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং নিজ নিজ বাড়ি, বিদ্যালয় কিংবা আশপাশের খালি জায়গায় গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করে। অনেক শিক্ষার্থী জানায়, তারা শুধু গাছ রোপণ করেই দায়িত্ব শেষ করবে না; নিয়মিত পানি দেওয়া, পরিচর্যা করা এবং গাছকে বড় করে তোলার কাজও করবে।
আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় দেশব্যাপী পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আরও জোরদার করা জরুরি।
তারা বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রত্যেকে বছরে অন্তত একটি ফলজ, বনজ অথবা ঔষধি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নিলে পরিবেশ সংরক্ষণে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
জামান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের কার্যক্রম শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি এবং সবুজায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে অতিথিরা শিক্ষার্থীদের হাতে ফলজ গাছের চারা তুলে দেন এবং সবাইকে পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রতিটি পরিবারকে বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ এবং তার নিয়মিত পরিচর্যার আহ্বান জানানো হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি গাছ শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, মানুষের জীবন ও অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলজ বৃক্ষ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা গেলে পরিবেশবান্ধব ও সচেতন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের মতে, কুলিয়ারচরের এই উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ের কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতিপ্রেমী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি কার্যকর পদক্ষেপ। এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়লে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।