
তৌহিদুল ইসলাম শামিম, হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
নিত্যদিনের অভাব-অনটন, ঘরে বিদ্যুৎ কিংবা নিজস্ব বই না থাকার মতো নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (GPA-5) অর্জন করেছেন জোহানা আক্তার সেবা। তিনি দিনাজপুরের হাকিমপুরের (হিলি) বাংলাহিলি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
দিনমজুর বাবা জামালউদ্দিন ও গৃহকর্মী মায়ের স্বপ্ন পূরণের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বইলেও অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে কাটছে না শঙ্কা। কলেজে ভর্তি ও সামনের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
হিলির বৈগ্রামের বাসিন্দা জামালউদ্দিনের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন বলতে একটি জরাজীর্ণ বসতবাড়ি। সংসার চালাতে বাবা দিনমজুরি করেন, আর মা অন্যের বাড়িতে কাজের পাশাপাশি একটি স্কুলে ঝাড়ু দিয়ে সামান্য কিছু আয় করেন।
জোহানার মা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মেয়ের যখন পরীক্ষা, ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেন/কুপি জ্বেলে কষ্ট করে পড়েছে। নিজের কেনা বই ছিল না। তিন-চারজনের কাছ থেকে বই চেয়ে এনে ওকে পড়তে দিয়েছি। আমি স্কুলে ঝাড়ু দিয়ে মাত্র এক হাজার টাকা পাই। তা দিয়েই কোনোভাবে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছি।”
বাবা জামালউদ্দিন বলেন, “অনেক কষ্টের মাঝেও আশা ছিল, মেয়ে আমার ভালো ফল করবে। সে আমার আত্মবিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে। কিন্তু সামনের পড়াশোনা চালানো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
জোহানা আক্তার সেবা জানান, অভাবের কারণে কখনোই প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাননি। তবে নিজের চেষ্টা ও বাবা-মায়ের কায়ক্লেশে চালানো কষ্টের মর্যাদা দিতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন একজন চিকিৎসক (ডাক্তার) হয়ে মানুষের সেবা করা এবং বাবা-মাকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, জোহানার মতো দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের পাওনা ও পরীক্ষার ফি ছাড় দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
এদিকে, বিষয়টি জানার পর হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা জানান, “উপজেলা প্রশাসন সবসময় এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে আছে। হিলিতে ‘হাকিমপুর ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ফান্ড রয়েছে, যা থেকে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা হয়। জোহানার উচ্চশিক্ষার জন্য প্রশাসনিক ও ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
মেধাবী জোহানার পড়ালেখা অব্যাহত রাখতে এবং তাঁর স্বপ্ন পূরণে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষদেরও এগিয়ে আসার আকুতি জানিয়েছে তাঁর পরিবার।