
আনিসুজ্জামান,জেলা প্রতিনিধি (কিশোরগঞ্জ):
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের গ্রেপ্তারকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গত ২ অক্টোবর তাকে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন। পরে ডিবি তাকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করে। ৩ অক্টোবর মামলাটিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।
তবে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তার গ্রেপ্তারকে ঘিরে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগদান
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে তিনি প্রাথমিক সহযোগী সদস্যের ফরম পূরণ করেন।
তার জামায়াতে যোগদানের সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর জামায়াতে যোগদানের খবর প্রকাশিত হয়। কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ৮ হাজার নেতাকর্মীর কথা বলা হলেও এ সংখ্যার স্বাধীনভাবে যাচাই করা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে কটিয়াদীতে তার মাধ্যমে দুই শতাধিক মানুষের জামায়াতে যোগদানের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
জামায়াতে যোগদানের সময় আখতারুজ্জামান ইসলামি মূল্যবোধ, দেশের স্বার্থ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে আলোচনা
জামায়াতে যোগদানের পর মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বিভিন্ন বক্তব্যে বিএনপি ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বলে তার সমর্থকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্ব, জুলাই আন্দোলন এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তার বিভিন্ন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
তার কিছু বক্তব্যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পর্কে সমালোচনামূলক মন্তব্য এবং জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ ভিডিও, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে এগুলোকে গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
মেজর আখতারুজ্জামান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কাছে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক কিছু তথ্য রয়েছে—এমন বক্তব্য দিয়ে থাকলেও, তিনি সেসব তথ্য প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন কি না এবং সেগুলোর সত্যতা কী, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘গ্রেপ্তারের পেছনে রাজনৈতিক কারণ’—এমন প্রশ্ন
মেজর আখতারুজ্জামানের সমর্থকদের একটি অংশের প্রশ্ন—বিমানবন্দরের ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের বিষয়টি কি প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেছে?
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি বা পুলিশি বক্তব্যে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যে তাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ঘটনার মামলাই গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করেছে।
ফলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত আক্রোশের অভিযোগকে আপাতত সমর্থকদের দাবি বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা হচ্ছে; এ বিষয়ে স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি এখনো পাওয়া যায়নি।
জুলাই আন্দোলনের সময়কার ঘটনার সঙ্গে তুলনা
মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবির হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের ২৬ জুলাই নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরদিন সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পরে নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবির হেফাজতে নেওয়া হয়। এভাবে ছয়জন সমন্বয়ক ডিবির হেফাজতে ছিলেন।
তৎকালীন ডিবির পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হেফাজতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে ছয় সমন্বয়ক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেন, তাদের স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছিল এবং ডিবি হেফাজতে থাকাকালে আন্দোলন প্রত্যাহারের যে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটিও তারা স্বেচ্ছায় দেননি।
এই অতীত ঘটনাকে সামনে রেখে কেউ কেউ বর্তমান গ্রেপ্তারকেও রাজনৈতিকভাবে দেখছেন। তবে দুই ঘটনার আইনি প্রেক্ষাপট এক নয়—২০২৪ সালের ঘটনাটি ছিল আন্দোলনকালীন ডিবি হেফাজত, আর মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বর্তমান ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারের কথা পুলিশ জানিয়েছে।
‘আগুনে পানি, নাকি পেট্রোল?’
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সমর্থকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে গ্রেপ্তার করার ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাদের বক্তব্য—বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একটি ঘটনার আইনি সমাধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের ভাষায়, কোথাও উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন; এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে শেষ পর্যন্ত মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে তার গ্রেপ্তারের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্য।
বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো—বিমানবন্দরের ঘটনায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং পুলিশ মামলাটিতে রিমান্ড চেয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগটি এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।
আনিসুজ্জামান
জেলা প্রতিনিধি কিশোরগঞ্জ
কার্ড নং ৮১
মোবাইল নাম্বার :০১৬৮৯৮৫৮৪২৭