
কামরুল
০১৮৮৩০৮৮০৮৪
বুদ্ধাব্দ হ’য়ে বঙ্গাব্দ” ও বাংলার নববর্ষ।
১৪৩২ বঙ্গাব্দ বিদায় নিয়ে,১৪৩৩ বঙ্গাব্দ হাজির হয়েছে, বাঙালির আঙ্গীনায়।বাংলা নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি চলছে।
“এসো হে বৈশাখ এসো এসো” এসো হে বৈশাখ।
তাপস নিশ্বাসে বায়ে, মৃত্যুকে দাও উড়ায়ে,
মুচে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নি স্বানে,
শুচি হোক ধরা।।
গানের কলি গুলো উঁকি মারছে বাঙালির প্রাণে।
বাংলা সনের পহেলা তারিখকে কেন্দ্র করে ব্যবসা- বাণিজ্যের হালখাতা নবায়ন করার সংস্কৃতি আবহমান
কালথেকে লালন করে আসছে সর্বস্তুরের বাঙালি।
ব্যবসার হালখাতার সঙ্গে সঙ্গে জীবন হিসাবের খাতা ও নবায়ন করতে হচ্ছে।আজ থেকে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে পাপ মুক্ত নতুন জীবন শুরু করার মাধ্যমে জীবনের হালখাতা নবায়ন করুক সকল স্তরের বাঙালি।
বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে মৌর্য সম্রাট এক কালজয়ী অমর পুরুষ ছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার কল্পে মহারাজ সম্রাট অশোক দশ কোটি সুবর্ণ মুদ্রা দান করেছিলেন। বৌদ্ধ ইতিহাসে তাঁর পুত্র মহেন্দ্র কুমার ও কন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে গমন করেছিল। গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণের কাল, বৌদ্ধ ধর্মের একটি অত্যান্ত গুরুত্ব পূর্ণ দিক হলেও বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষক ভিন্ন- মতে সন-তারিখ উল্লেখ করে থাকেন। এ বিষয়ে একটু আলোকপাত করা দরকার। সিংহল, মায়ানমার,থাইল্যান্ড, দেশীয় বৌদ্ধদের বর্ষ গণনা অনুসারে যীশু খ্রিষ্টের জন্ম বা আবির্ভাবের ৫৪৩ বছর পূর্বে গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন এবং মহামানব বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভ হতে বুদ্ধাব্দ গণনা করলে খ্রিষ্টের জন্মের খ্রিষ্টপূর্ব (৪৯৮-৫৪৩) বছর পূর্বে বুদ্ধ পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। তবে খ্রিষ্টীয় ১১ শতক হতে সিংহল ও মিয়ানমারে ২৫০০(আড়াই হাজার বৎসর) তথা পরিনির্বাণ দিবস উৎযাপনের মধ্যদিয়ে মহামানব গৌতম বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর থেকে নতুন ভাবে বুদ্ধাব্দ গণনা শুরু হয়,ফলে বর্তমান বুদ্ধাব্দের তারিখটি বুদ্ধের পরিনির্বাণ এর পর থেকে গণনা হয়ে আসছে বিধায় বুদ্ধাব্দ থেকে বঙ্গাব্দের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ১৯৫৪ সনের ১৭ই মে মহামানব গৌতম বুদ্ধের পরিনিবার্ণের ২৫০০ বর্ষপুর্তি উপলক্ষে দুই বৎসরাধিক কালব্যাপী মায়ানমার রাজধানী রেঙ্গুনে ষষ্ঠ মহাসংগীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের ২৪ এ মে শুভবৈশাখী পূর্ণিমায় বুদ্ধের ২৫০০তম পরিনির্বাণ বর্ষপূর্তি ও ৬ষ্টমহাসংগীতি মহাসমারুহে সমাপ্তি হয়। এর পর থেকে ১৭ই মে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন হয়ে আসছে। তবে ১৪ই এপ্রিল বৈশাখী মেলা পালন তথা ১৫ই এপ্রিল থেকে বুদ্ধাব্দ গণনা করা অধিক যুক্তিসঙ্গত এবং ঐ সময়ে প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ড: প্রবোধ চন্দ্র সেন গ্রীসের মানমন্দিরে রক্ষিত চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের রেকর্ড পত্র বিশ্লেষণ করে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও পরিনির্বাণের সন,তারিখের তালিকা ‘দি স্টেটম্যান্ট’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন এবং উক্ত বিবরণে বলা হয় সিদ্ধার্থের জন্ম ৭ই এপ্রিল ৬২৫ খ্রিষ্ট- পূর্বাব্দে, বুদ্ধত্ব লাভ ১৫ই এপ্রিল ৫৯০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এবং মহাপরিনির্বাণ কাল ২২ই এপ্রিল ৫৪৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। যাইহোক গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাব কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৬শ অব্দে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধবিহার গ্রন্থে আলী ইমাম লিখেছেন- পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব ৭ইএপ্রিল ৬২৩ অব্দে,খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ই এপ্রিল ৫৮৮ অব্দে বুদ্ধত্ব লাভ।অনেক বৌদ্ধ ইতিহাস গবেষকদের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ২২ এপ্রিল ৫৪৩ অব্দে কুশী- নগরের জমক- শালবৃক্ষের নিচে তিনি মহাপরিনির্বান লাভ করেছিলেন।
তবে একথা স্বীকার্য যে,মহামানব”গৌতম বুদ্ধ”পৃথিবীর ইতিহাসের এক অনন্য মহাপুরুষ যাঁর ত্রিলক্ষণ অভিধা- বুদ্ধ ব্যতীত অন্য আর নেই, একই দিনে যাঁর জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ ঘটে, তাঁর সন-তারিখ কমবেশী প্রায় ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে পাওয়া যায় এবং বর্তমান কালে বিভিন্ন গবেষক ইতিহাসবিদ ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই মত সর্বাধিক ব্যবহৃত। বৈশাখের প্রথম দিনটি নববর্ষ হিসেবে পরিগণিত। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিন কয়েকঘন্টার প্রয়োজন হয়।এই সময়টা সৌর বছর। গ্রেগরীর সনের মতো বারো মাসে বঙ্গাব্দ সূচনা সম্পর্কে দুটি মত প্রচলিত। প্রথম মত অনুযায়ী প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্ক বঙ্গাব্দ চালু করে ছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে শশাংক বাংলার রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন। আধুনিক বাংলা বিহার তাঁর সম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল। অনুমান করা হয় যে,গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির ২০ই মার্চ শনিবার ৫৯৪ সনে বঙ্গাব্দের সুচনা হয়েছিল।
দ্বিতীয় মত অনুযায়ী ইসলামী শাসন আমলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চাঁন্দ মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বছরের চেয়ে সৌর বছর ১১/১২ দিন কম হয় কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিনে, চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে হয় এ-ই কারণে চন্দ্র বছরের ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। বাংলায় চাষাবাদ সহ অনেক কাজ ঋতুনির্ভর, এজন্য মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে, প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে,তিনি সৌরপঞ্জিকা রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।
মোঘল সম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্যা শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষকগণের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরেও লিখতে ও পড়তে তাঁকে আগ্রহী করা যায়নি। প্রাতিষ্ঠানিক এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না জানা মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত,বিচক্ষণ এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তবে দীর্ঘ শাসনামলে মোগল সর্বাদিক সম্প্রসারিত হয়েছিল এবং মুসলিম শাসক হলেও ভারত বর্ষের সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে তার সু-সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং হিন্দু-মুসলিম প্রধান, দুই দু- সম্প্রদায়ের মিলিত সহযোগিতায় দেশ শাসন করেছিল। উত্তর ভারতের অসীম সাহসী ও স্বাধীনচেতা রাজপুত্রদের সমর্থন লাভে এবং বশে আনতে রাজপুত নারী যোধাবাঈকে বিয়েও তিনি করেছিলেন। যোধাবাঈয়ের ভ্রাতা মানসিংহ ছিলেন সম্রাট আকবরের সেনাপতি। মানসিংহ বঙ্গে এসে- ছিলেন ঈসাখাঁকে দমন করতে। এই ঢাকাতেই মানসিংহ প্রান ত্যাগ করেছিলেন। অসংখ্য ভাষাভাষি ভারতীয়দের ধর্মাচার ও জাতীয়তাকে সম্রাট আকবর যথার্থ মর্যাদা এবং সম্প্রীতির বন্ধনে রেখে ছিলেন বলেই তার শাসনামলে রাজ্যে-রাজ্যে বিদ্রোহ হয়নি। রাজক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি প্রসারে হিন্দুধর্মালম্বী তীর্থ যাত্রীদের কর পর্যন্ত তিনি মওকুফ করেছিলেন।
সকল ভারতীয়দের একক ধর্মের অধীন করতেই,
দিন-ই- ইলাহি নামক নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন। এতে ধর্মীয় রক্ষণশীলেরা সম্রাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। ধর্মবিদ্বেষী আখ্যায়িত করে তাকে সিংহাসনচ্যুত করতে নানা চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন ধর্মীয় নেতা ও সমাজপতিরা।
সম্রাট আকবর দিন-ই-ইলাহির মাধ্যমে ভারত বর্ষের প্রধান ধর্ম সমূহকে একীভূত করতে চেয়েছিলেন। আকবরের জোড়াতালির ধর্ম বিশ্বাস,ভারতীয় সমাজপতিদের আকৃষ্ট করতে পারেনি এবং সংখ্যাগরিষ্ট সাধারণ মানুষ সম্রাটের বিরুধিতা না করলেও অসহিষ্ণু আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ধর্মীয় নেতা ও সমাজপতিরা। অনেক মুসলিম ধর্মীয় নেত্রী বৃন্দকে একারণে নিগৃহীত ও নির্যাতন সহ কারাবরণ করতে হয়েছিল। অত্যন্ত বিচক্ষণ বুদ্ধির অধিকারী আকবর ছিলেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত। রাজ্যদখল, ধনরত্ন-সম্পদ লুট-পাট সম্রাটদের স্বাভাবিক বিষয়রূপে গণ্য ছিল। রাজ কোষাগার পূরণ করতে লুটপাটের পাশাপাশি সম্রাট আকবর ভূমি রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছিল। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক তৃতীয়াংশ রাজস্ব হিসাবে আদায় করা হত। এর ব্যতিক্রমী কৃষকদের উপর নেমেআসত নিষ্টুর খড়গ। সব আবাদি জমিতে চাষাবাদের যেমন বাধ্য করা হতো, তেমনি অনাবাদি কোন জমি রাখা যেত না। সেইজন্য নিয়োজিত ছিল সম্রাটের রাজকর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং স্থানীয় সম্রাটের অনুগত সমাজপতিরা। জমির জরিপে অতীতের দড়ি দিয়ে জমি মাপার পদ্ধতি বাতিল করে লম্বা বাঁশ দিয়ে জমি মাপার পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। যাতে জমির পরিমাপের হেরফের না হয়।
সম্রাটের অনুগত সমাজপতিদের উপর অর্পিত ছিল জমির প্রতিটি অংশের খাজনা নির্ধারণ ও আদায়ের। আকবর নিজে সম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চল গুলোতে দ্রব্য সামগ্রীর পরিবর্তে, অর্থমূল্যে খাজনা আদায়ের নির্দেশ জারী করায় কৃষকরা মারাত্মক দূর্ভোগের মুখে পড়েছিল। মোড়লদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে উৎপাদিত ফসল হাটে বিক্রি করে, কৃষকরা খাজনা প্রদানে বাধ্য হয়েছিল। খাজনা প্রদানের পাশাপাশি কৃষকদের রাষ্ট্রীয কাজে বিনা মজুরিতে শ্রম দিতে হতো। যুদ্ধ-বিগ্রহে, দুর্গ, রাস্তাসহ নানা নির্মাণকাজে বিনা পারিশ্রমিকে কৃষকদের অংশ নিতে হতো। এর ব্যত্যয়ের উপায় ছিল না। ভারতবর্ষের কৃষি অর্থনীতি গড়ে ওঠার পেছনে সম্রাট আকবরের নানা উদ্যোগ অব্যাহত ছিল। সম্রাট আকবরের শাসনামলে বঙ্গদেশ মোগলদের অধীন থাকায় কৃষি প্রধান বঙ্গদেশের ঋতু প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং ফসল ওঠার মৌসুমকে উপলক্ষ করে অবাঙালি সম্রাট আকবর হিজরি সালের সঙ্গে সৌর হিসাব গণনায় বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন। শুরুতে আকবরি সাল নামকরণ থাকলেও পরবর্তীতে তা বঙ্গাব্দরূপে বঙ্গদেশে প্রসার লাভ করেছিলেন। গ্রামীণ জীবন থেকে শুরু হলেও বঙ্গাব্দের বিস্তার ঘটে পুরো বঙ্গদেশে। ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্রবর্ষ পঞ্জিকাকে সৌরবর্ষ পঞ্জিতে রূপান্তরের দায়িত্বদেন। ফজলুলাহ শিরাজীর সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তাঁর সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে পঞ্জিকা প্রচলনের নিদের্শ দেন। এ জন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গননা শুরু হয় বলে অনেকে মত পোষন করেন। যাইহোক সম্রাট অশোকের পর বাংলা নববর্ষ জাঁক জমক ভাবে পালন শুরু হয় সেই মোঘল আমলে থেকে, বাদশা হুমায়নের ইন্তেকালের পর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন তাঁরই যোগ্য পুত্র মোঘল সম্রাট আকবর। তিনি রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রজাদের কল্যানে সংস্কার মূলক অনেক কাজ সংস্কার করেন। মূলত বৈশাখী মেলা আয়োজন রাজা শশাংকের আমল হতে সম্রাট আকবরের আমলে ও বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে নগরে উৎসব আকারে পালিত হতো এবং ক্ষেত্র বিশেষে মগাব্দ বা কোন কোন ক্ষেত্রে বুদ্ধাব্দ মুখে মুখে প্রচলন হয়ে আসছিল। বুদ্ধিদীপ্ত সম্রাট আকবর সেই বৈশাখী মেলার দিন তারিখ ফলো করে বঙ্গাব্দ গননার সমন্বয় করে ছিল বলে ধারনা অমূলক নয়। এছাড়া আরো ধারণা করা হয়
যে,১৫ই এপ্রিল ৫৮৮ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে শাক্যসিংহ সিদ্ধার্থ বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন এবং গৌতম বুদ্ধ ছিলেন ততকালীন ভারত বর্ষ তথা সমগ্র জম্বুদ্বীব ও মগধ রাজ্যের অন্যতম ধর্মীয় গুরু এবং এ-ও সত্যি যে,গৌতম বুদ্ধত্ব লাভের পর থেকে বৈশাখী মেলা পালিত ও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। একথা কার ও অজানা নেই যে, বৌদ্ধ ধর্ম এক সময় ভারত উপমহাদেশে বিশাল প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত শীলালিপি ও প্রত্ন-তাত্ত্বিক নির্দেশনা সমূহ তার সত্যতা প্রমাণ করে। সাঁচীস্তুপ, সারানাথ, কুশিনারা, সোমপুর ও শালবন প্রভৃতি এলাকায় প্রত্ন-তাত্ত্বিক নিদের্শন অতীতের বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধগৃহী সমাজের অবস্থান এবং তাদের ধর্মীয় আচার আচরণের পরিচয় দে, সম্রাট অশোক,সম্রাট কনিষ্ক ও সম্রাট হর্ষবর্ধনের প্রচেষ্টায় ভারত উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের অভাবিত উন্নতি ঘটে। কিন্তু কালের বির্বতনে নানান ঐতিহাসিক কারণে বৌদ্ধ জাতী- গোষ্টি ভারতের দক্ষিণ পূর্ব কোনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারতের বদ্বীব দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত। অনুমান করা হয় সম্রাট অশোকের পূর্ববতী কালে বৌদ্ধধর্ম উত্তরবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংস্কৃত বিনয় পিটকে উপসম্পদা বিষয়ক অধ্যায়ে পুন্ডু – বর্ধনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুন্ডুবর্ধন উত্তরবঙ্গের একটি প্রসিদ্ধ জনপদ সাঁচীতে প্রাপ্ত দুইজন পুন্ডবর্ধন বাসী কতৃক প্রদত্ত দু’খানি শীলা লিপিতে উৎর্কীন লিপি দৃষ্টে খৃঃপূঃ দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধগৃহী ও বৌদ্ধধর্মের অস্থিত্ব খুজে পাওয়া যায় এবং মহাস্থানগড় ও নাগরযোনী কোন্ডা শীলালিপিতে এ কথা সমর্থন যোগ্য। খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দী থেকে সপ্তম শতাব্দীর ভিতর বহুচীনা পরিব্রাজক বৌদ্ধধর্ম দর্শন অধ্যায়ন করার জন্য ভারত উপমহাদেশে এসেছিলেন। যেমন ফা-হিয়েন, হিউয়েনসাঙ ও ইংসিঙের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ফা-হিয়েন পঞ্চম শতাব্দীতে তাম্র লিপিতে (বর্তমান মেদেনিপুরে) সূত্র গ্রন্থের প্রতিলিপি প্রনয়ন ও বুদ্ধ প্রতিবিম্বের নকশা অংকন করেছিলেন। ততকালীন সময়ে তিনি বাইশটি বৌদ্ধ বিহার দেখেছেন বলে তার ভ্রমন বিবরনীতে উল্লেখ করেন। এতে প্রমানীত হয় খ্রীষ্টিয় ৬ষ্ঠ শতব্দীতে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম সু-প্রতিষ্ঠিত ছিল। এছাড়া ও হিউয়েন সাঙ নামে একজন চীনা পরিব্রাজক সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ও পুন্ড্রবর্ধনে প্রধান বিশটি বৌদ্ধ বিহার বিশ্ববিদ্যালয় সহ তিন হাজারের ও অধিক বৌদ্ধ বিহার ছিল বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন বৌদ্ধ রাজবংশ যথা খড়গ বংশ, পাল বংশ, চন্দ্র বংশ,মৌর্জ্য বংশও পট্রিকের অস্থিত্ব ছিল। উক্ত রাজবংশ গুলোর মধ্যে পালবংশ হল সবচেয়ে প্রধান। পাল রাজাগণ প্রায় সাড়ে চারশত বৎসরের অধিক সময় বাংলা বিহার উরিষ্যা শাসন করেন। বাংলার ইতিহাসে পালযুগকে “বৌদ্ধ ধর্মের” সুবর্ণ যুগ বলে অবহিত করা হয়। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ও পৃষ্টপোষক ছিলেন এবং তাদের প্রত্যেক সরকারী কার্য্য বিবরণীর প্রারম্ভে মহামানব বুদ্ধের উদ্দেশ্য লিখিত প্রার্থনা সূচক বাণী দেখা যায়-বগুড়া, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুরের প্রত্ন-তাত্ত্বিক নিদর্শনে তার প্রমাণ বিদ্যমান।
অবাঙ্গালি সম্রাট আকবর জাতিসত্তার প্রতি গভীর প্রীতিতে কিন্তু সালটির প্রবর্তন করেননি। খাজনা আদায়ের মোক্ষম সময় বিবেচনায় সালটি প্রবর্তন করেছিলেন। কৃষকদের থেকে বঙ্গাব্দের যাত্রা শুরু হলেও সব পেশার মানুষ বঙ্গাব্দ অনুসরণে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছিল। মোগল সম্রাজ্যের পতনের পর ইংরেজ শাসনের আবর্তে প্রচলিত বঙ্গাব্দ খ্রিষ্টীয় সালের প্রভাবে কোণঠাসার কবলে পড়ে। ব্রিট্রিশ সরকার আমলে ভারতের বঙ্গাব্দের ব্যবহার শংকটের মুখে পড়েছিল বটে, তবে কিন্তু পরিত্যক্ত হয়নি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থে-বিত্তে, জমিদারিতে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল অগ্রসর।সে তুলনায় মুসলিম সম্প্রদায়ছিল পশ্চাৎপদ। বাংলা সন-তারিখের ব্যবহার হিন্দু সম্প্রদায় অধিক হারে ব্যবহার করত বলেই বঙ্গাব্দ তথা বাংলা সনের ওপর হিন্দুয়ানি মোড়ক সেঁটে দেবার নানা চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি শাসকেরা।সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান বঙ্গাব্দের বিরোধীতা করেছিল বটে, তবে তা হিজরী সনকে চাপানোর উদ্দেশ্যে নয়। বঙ্গাব্দকে নির্মূল করতেই তৎকালীন সরকার পাকিস্তানের শত্রু এবং প্রতিপক্ষরূপে হিন্দুদেরই বিবেচনা করত,অণ্য ধর্মাবলম্বীদের নয়। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে তো বটেই। পাকিস্তানি আমলে বাংলা সন-তারিখের ব্যবহার গ্রামীণ বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই ব্যবহৃত হতো। নগরকেন্দ্রীক মানুষের মধ্যে ততটা নয়। নববর্ষ কেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের উৎসব পার্বণের তেমন নজিরও ছিল না। আমাদের জাতীয়বাদী উন্মেষে শহরকেন্দ্রীক বাংলা নববর্ষ পালনের প্রবণতা গড়ে ওঠে। তবে ব্যাপক আকারে নয়,সীমিত পরিসরে। অপরদিকে
হিন্দু সম্প্রদায় কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালনের পাশাপাশি চৈত্রসংক্রান্তি মেলার ও আয়োজন করত।সেই চৈত্রসংক্রান্তি মেলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হতো। ঢাকার লালবাগ শশ্মানঘাটের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বিশাল জায়গাজুড়ে চৈত্রসংক্রান্তি মেলা হতো। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় সেই মেলাকে চৈত্য পূজার মেলা বলে অভিহিত করত। চৈত্রের শেষ দিনটিতে বৃষ্টি ছিল অনিবার্য। বাংলা নববর্ষের দিন হিন্দু সম্প্রদায় স্নান শেষে নতুন জামা-শাড়ি গায়ে পড়িয়ে অভূক্ত অবস্থায় আমের শাখা-ঘট ইত্যাদি নিয়ে ছুটত মন্দিরে পূজা দিতে। মন্দির থেকে ফিরেই আহার করত,তবে মুসলিম পরিবারে এদিনে উৎসব পার্বণের বিন্দুমাত্র আমেজ ছিল না।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহে হিন্দু ধর্মালম্বীদের ব্রাহ্মণ দিয়ে পূজা অর্চনার ন্যায় মুসলিম ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মৌলভী দিয়ে মিলাদের আয়োজন করত। কিন্তু গৃহে পারিবারিক পরিমন্ডলে মুসলিম সম্প্রদায়ে দিনটি মোটেও পালিত হতো না। বাংলা নববর্ষ কেন্দ্রীক উৎসবকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আধিক্যে দিবসটিকে অসম্প্রদায়িক ভাবার উপায় ছিল না। আমাদের দেশের প্রতিটি শহরে বাংলা নববর্ষে উৎসব তেমন পালন হতে দেখা যায় না। তবে বঙ্গাব্দের সন-তারিখের ভিত্তিতে একমাত্র এই দিনটিকেই আমরা পালন করে থাকি। আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে দ্বিতীয় অপর একটি দিন-খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা বাংলা সন তারিখের ভিত্তিতে পালিত হয়ে থাকে। তার অন্যতম হলো বাংলা সনের প্রচলন। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, খ্রীষ্ট পূর্ব ২৭২ অব্দে থেকে ২৩২ অব্দে যখন মহামতি সম্রাট অশোক মগধের সিংহাসনে অধিষ্টিত হন তখন বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস ধরে রাখার জন্য বুদ্ধাব্দের প্রচলন করে ছিলেন এবং বাংলা নববর্ষে প্রত্যেক নগরে- গ্রামে ধুমধামের সহিত বৈশাখীমেলা পালন হতো সপ্তাহ থেকে মাসব্যাপী। যেমন বর্তমান সময়ে রামুর রাংকুট বিহারে, মহামুনী পাহাড় তলীতে, ঢাকার রমনাবটমূলে, উত্তর পটিয়ার চক্রশালায়, ফটিকছড়ির কোটের পাড়ে, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় এবং দেবপাহাড়ে, দক্ষিণ পটিয়ার জুলদার দেওয়ান পাহাড়ে, লোহাগাড়ার চেঁদীরপুনিতে, সাতকানিয়া,র ঢেমশাতে ও হাটহাজারীর কাটির হাট সহ আরও অন্যান্য নগরে সপ্তাহ ব্যাপী বৈশাখী মেলা পালন হয়ে আসছে । এছাড়া অনেকে রাজা বিম্বিসারের আমল থেকেই বৈশাখী মেলা আয়োজন হয়ে আসছে বলেও ধারনা করেন। মূলত বুদ্ধাব্দ থেকে মগাব্দ হয়ে বঙ্গাব্দের উৎপত্তি-কালক্রমে গ্রামীণ জনপদের কৃষকের খাজনা প্রদানের ওপর ভিত্তি করে যে,বঙ্গাব্দের উৎপত্তি,সেই কৃষকের জীবনাচার বাংলা নববর্ষ পালনের দৃষ্টান্ত কিন্তু এখন আর নেই। কেবল শহরের মানুষদের আনন্দ বিনোদনের উপলক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের বাকিতে বেচা-বিক্রির হালখাতার প্রচলনও এখন আর তেমন নেই। মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা বেশিরভাগই যাকাত প্রদানের সুবিধায় রোজার মাসে হালখাতা নবায়ন করে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে হালখাতা প্রচলন রয়েছে। তবে অধিকাংশ খ্রিষ্টীয় বর্ষের অনুসরণে এখন হালখাতা করে থাকে। সামগ্রীক বিবেচনায় আমাদের সমাজ জীবনে বঙ্গাব্দের আবেদন তেমন নেই। বিলুপ্ত প্রায় বঙ্গাব্দ একটি দিনেই জেগে ওঠে প্রবল বেগে। সেটি বাংলার নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। রাজধানীসহ দেশের সব শহরের নববর্ষ অতিমাত্রায় -আড়ম্বতায় পালিত হয়।
নববর্ষ পালনে ভোগবাদিতার সীমা-পরিসীমা থাকে না। অথচ চেতনার স্থানটি ছিল বড়োই শূন্য। আমাদের ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তা আজ বিশ্বায়ন নামক হুমকির কবলে,
যা আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। উৎসবের আধিক্য ভোগবাদিতা যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে কোন আশাবাদী হবার কারণ নেই। অন্তঃসারশূন্য উৎসবের আধিক্য জাতীয়তা বোধ আমাদের সমাজ জীবনে নিম্নতম প্রভাব ফেলেছে বলেও ভাবা যায় না,দেশের সংখ্যা- গরিষ্ট মানুষ নববর্ষের উত্তাপ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে।এই উৎসব-আনন্দ তাদের স্পর্ষ করতে পারে না। বিশেষ করে বাংলার আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্টির জীবন মান উন্নয়নে ভূমিকা নেওয়া সহ আমরা চাই অসম্প্রদায়িক, এই উৎসব আমাদের জাতীসত্ত্বার প্রতিটি মানুষের মিলিত উৎসবে পরিণত হোক এবং সকল বীর বাঙালির পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা ও সহমর্মিতায় এক নতুন দিনের দিগন্ত উন্মোচন হবে এবং বৈষম্যমূলক আচার-আচরণ নিরসন হউক। তাহলেই পারস্পরিক মৈত্রী,করুনা,সৌহার্দ্যে,সম্প্রীতির সুন্দর বন্ধনে, আমরা সামষ্টিক বিবেচনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারব এবং ভোগ বাদিতার অবসান হবে ও জাতীয়তার চেতনা শাণিত হবে। ফলে সব মানুষের মৌলিক আধিকার ও সুযোগের সাম্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সকলের অংশগ্রহণে পালিতহবে বাঙালির একমাত্র অসম্প্রদায়িক বাংলা নববর্ষ তথা বৈশাখী মেলা।তবেই বাংলার নববর্ষ উৎযাপন-তথা বৈশাখী মেলা
সার্থক হবে।