
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে খুঁটি থেকে লাফিয়ে খালে গোসল করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আব্দুল্লাহ মিয়া (১১) নামে এক স্কুলছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের বধূনগর গ্রামের একটি খালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর রাতে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত আব্দুল্লাহ মিয়া বধূনগর গ্রামের প্রবাসী নজরুল মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের ছোট ছেলে আব্দুল্লাহর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে আব্দুল্লাহ তিন সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পাশের বধূনগর খালে গোসল করতে যায়। চার বন্ধু খালের পাশের একটি বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহার করে লাফিয়ে পানিতে নামছিল। ওই সময় বিদ্যুতের খুঁটিতে সংযোগ ছিল না বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করে খুঁটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হয়ে যায়। এতে খুঁটির সংস্পর্শে থাকা আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পানিতে পড়ে যায়। একই সময় সঙ্গে থাকা অপর তিন কিশোরও বিদ্যুতের শক অনুভব করে। তবে তারা কোনোভাবে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। আব্দুল্লাহ পানিতে পড়ে যাওয়ার পর আর ওপরে উঠতে পারেনি।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন দ্রুত সেখানে জড়ো হন। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। ভৈরব বাজার ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
ভৈরব বাজার ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের টিম লিডার তোফাজ্জল হোসেন জানান, খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অভিযান চালানোর পর রাত ৭টা ২০ মিনিটের দিকে খাল থেকে আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহতের আত্মীয় মাসুম মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন মেরামতের কাজ করছিলেন। কাজের সুবিধার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ সংযোগ চালু হয়ে যাওয়ায় খুঁটির আশপাশে থাকা চার কিশোর বিদ্যুতের উপস্থিতি অনুভব করে। তিনজন দ্রুত তীরে উঠতে পারলেও আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, আব্দুল্লাহ ছিল পরিবারের সবার ছোট। তার বড় এক ভাই ও এক বোন রয়েছে। তার বাবা ও বড় ভাই বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। ছেলের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
এ ঘটনায় বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজনেরা। আব্দুল্লাহর বোনজামাই রাজু মিয়া বলেন, বিদ্যুতের কাজ চলার সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কথা থাকলেও কীভাবে আবার বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হলো, তা তদন্ত করে দেখা দরকার। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতির কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকেই ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি ও পানির সংযোগস্থলে কাজ চলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ মেরামতের কাজ শেষে কখন এবং কীভাবে সংযোগ চালু করা হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, পানিতে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করার পর এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজন ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালুর প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনেরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ মেরামতের কাজ চলাকালে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাত্র ১১ বছর বয়সে আব্দুল্লাহর এমন করুণ মৃত্যু তার পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। একটি আনন্দময় গোসল মুহূর্তেই পরিণত হয় মর্মান্তিক ঘটনায়।