
শিবলী সাদিক খানঃ
মাদক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে, অপরাধ বাড়ায় এবং যুবসমাজকে অচল করে দেয়। মাদকাসক্ত শুধু নিজেদের মেধা ও জীবনীশক্তিই ধ্বংস করছে তা নয়, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলাও বিঘ্নিত করছে নানাভাবে। মানুষের চিন্তায় কর্মে ও মননে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে।
আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, গাজা, ফেনসিডিল, মদ, আফিম, হেরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ, এমনকি জুতার আঠাও রয়েছে। এসব ভয়ানক নেশা জাতীয় দ্রব্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে। যেসব পরিবারের সদস্য নেশাগ্রস্ত হয়েছে, সেসব পরিবারের দুর্দশা অন্তহীন। জীবনবিধ্বংসী এ নেশার কবলে পড়ে অসংখ্য তরুণের সম্ভাবনাময় জীবন নিঃশেষিত হচ্ছে। মাদকাসক্তি আসলে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি, বিচারক্ষমতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব, আদর্শ সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে শিশুকিশোর ও তরুণ-তরুণী। বিশাল সংখ্যক মাদকাসক্তের মধ্যে আবার প্রায় ৫৯ দশমিক ২৭ শতাংশ শিশু-কিশোর সঙ্গদোষ ও বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে, ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ কৌতূহলবশত হয়ে মাদক সেবনের মাধ্যমে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। মাদকাসক্ত হওয়ার প্রধান কারণ হলো মাদকের সহজলভ্যতা।
মাদকাসক্তদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, তাই যেকোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বিবেক বাধা দেয় না। মিথ্যা কথা বলা তাদের স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। ভালোবাসা কিংবা স্নেহ-মমতাও তাদের হৃদয় স্পর্শ করতে পারছে না। মাদক সেবনকারীর দেহমন, চেতনা, মনন, প্রেষণা, আবেগ, বিচারবুদ্ধি সবই মাদকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নেশা ও মাদকাসক্তির ভয়াবহতা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তরুণ সমাজের বহু মেধাবী ও সম্ভাবনাময় প্রতিভা মাদকের নেশার কবলে পড়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। খুন ছিনতাই ধর্ষণ এর মত ভয়াবহতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু মাদকাসক্তি ও নেশাজাতীয় দ্রব্য মানবসমাজের জন্য সর্বনাশ ও চিরতরে ধ্বংস ডেকে আনে, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধুদের কুপ্রচারণা, অসৎ সঙ্গ, নানা রকম হতাশা থেকে বাড়তি কৌতূহল বশত মস্তিষ্কে বাসা বাঁধে মাদকাসক্তি ইসলাম ধর্মীয় আদর্শে মাদকদ্রব্যকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের অগ্রযাত্রাকে প্রাণঘাতী নেশার ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষার জন্য মাদকের বিস্তার রোধে মাদক চোরাচালানকারী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবন থেকে মাদকদ্রব্য উৎখাত এবং মাদকাসক্তি নির্মূল করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ এবং ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন।
মাদক প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠন এনজিও, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা অন্যান্য ধর্মের বিশিষ্টজন, পিতামাতা, অভিভাবক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
মাদকাসক্তি একটি জঘন্য সামাজিক ব্যাধি, তাই জনগণের সামাজিক আন্দোলন, গণসচেতনতা ও সক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে এর প্রতিকার করা সম্ভব। যার যার ঘরে পিতা-মাতা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাড়া, মহল্লা বা এলাকায় মাদকদ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ঘৃণা প্রকাশের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে নিয়মিত সভা-সমিতি, সেমিনার, কর্মশালার আয়োজন করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ভয়াবহ পরিণাম -সম্পর্কিত সতর্কতা ও শিক্ষামূলক ক্লাস নিতে হবে। অষ্টম শ্রেণী থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বছর ডোপ টেস্ট করতে হবে এবং যে কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরিতে নিয়োগের পূর্বে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলে যুব সমাজ এর মাদকাসক্তির প্রবণতা কমে আসতে পারে।
সর্বগ্রাসী মাদক যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। আমরাই মাদককে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মুল করব।