
সিলেট জেলা প্রতিনিধি:জাহিদ হাসান
স্বাধীনতার পর কেটে গেছে ৫৪ বছর। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সরকার, জনপ্রতিনিধি ও উন্নয়নের নানা চিত্র। কিন্তু বদলায়নি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পশ্চিম ভিত্রিখেল ও ৯নং ওয়ার্ডের উত্তর বিড়াখাই গ্রামের মানুষের ভাগ্য। আজও তাদের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের রাস্তাটি পড়ে আছে অবহেলা ও উন্নয়নবঞ্চনার অন্ধকারে।
দুটি গ্রামের প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের একমাত্র এই রাস্তাটি বর্তমানে বেহাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। বর্ষা এলেই রাস্তার বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় কাদা, গর্ত ও জলাবদ্ধতা। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, রোগী, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে এই রাস্তায় সামান্য মাটি ফেলা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। যুগের পর যুগ ধরে রাস্তাটি পাকাকরণের দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতির বন্যা
স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্বাচন এলেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তখন এই রাস্তা পাকাকরণের প্রতিশ্রুতিও শোনা যায় জোরেশোরে। প্রার্থীরা বলেন, নির্বাচিত হলে সর্বপ্রথম এই রাস্তার উন্নয়ন করা হবে।
কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির আর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস ও অপেক্ষার রাজনীতি। নির্বাচনের আগে রাস্তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু, আর নির্বাচনের পরে তা আবারও পড়ে থাকে অবহেলার অন্ধকারে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—নির্বাচনের আগে যে রাস্তা নেতাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, নির্বাচনের পরে সেই রাস্তার গুরুত্ব কোথায় হারিয়ে যায়?
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত দুর্ভোগ
এই দুই গ্রাম থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে তাদের প্রতিদিন নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাদা ও গর্তে ভরা রাস্তা পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে হয়।
অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, রাস্তার দুরবস্থার কারণে সময়মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো পোশাক নষ্ট হওয়া, যানবাহন চলাচলে সমস্যা এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
জরুরি মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা রাস্তা
স্থানীয়দের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে অ্যাম্বুলেন্স বা অন্যান্য যানবাহন চলাচলেও নানা সমস্যা দেখা দেয়।
স্থানীয়রা বলেন, একজন রোগীর জন্য যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে একটি রাস্তার কারণে যদি চিকিৎসা পেতে দেরি হয়, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে?
এলাকাবাসীর একটাই দাবি—প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব উন্নয়ন
এলাকাবাসী জানান, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নন। তারা শুধু তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে একটি চলাচলযোগ্য রাস্তা চান। উন্নয়নের এই আধুনিক যুগে একটি গ্রামের মানুষের বছরের পর বছর একটি রাস্তার জন্য অপেক্ষা করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক।
এলাকাবাসীর দাবি, রাজনীতি হোক জনগণের কল্যাণের জন্য, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হোক বাস্তবায়নের জন্য এবং উন্নয়ন হোক মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের জন্য।
পশ্চিম ভিত্রিখেল ও উত্তর বিড়াখাই গ্রামের মানুষের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান—দীর্ঘদিনের এই জনদুর্ভোগের অবসান ঘটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আর পুনরাবৃত্তি নয়—এবার প্রয়োজন বাস্তব কাজ।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত রাস্তাটির সংস্কার ও পাকাকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং দীর্ঘ ৫৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাবে।
“আমরা আর প্রতিশ্রুতি চাই না—আমরা চাই একটি পাকা রাস্তা, চাই নিরাপদ চলাচলের অধিকার।”