
অনেক, অনেক বছর আগে, সিলেটের এক নির্জন হাওরে, যেখানে চাঁদ উঠলে কুয়াশা ঢেকে যায়, আর হাওরের বুক কাঁপে অজানা সুরে, সেখানে বাস করত এক ভয়ঙ্কর জেলে। কিন্তু সে ছিল মানুষ নয়, ছিল অর্ধেক কুমির আর অর্ধেক মানুষ—তাকে সবাই ডাকত “ডিঙ্গির টোপর” নামে।
লোককথা বলে, সে জন্মেছিল চাঁদের অমাবস্যা রাতে, যখন এক পাগল জেলে তার নৌকায় এক অলৌকিক ডিম পায়। সেই ডিম ফাটার পর জন্ম নেয় এক শিশু, যার মাথা ছিল কুমিরের মতো, চোখ জ্বলজ্বলে, আর শরীরে মানুষের মতো দগদগে চামড়া। লোকেরা ভয় পেয়ে শিশুটিকে ফেলে দেয় হাওরে। কিন্তু হাওর তাকে গ্রহণ করে, আর কালক্রমে সে হয়ে ওঠে “হাওরের অভিশাপ।”
দিনে সে ঘুমাত পচা কাদায়, আর রাতে উঠে পড়ত—তার লম্বা দন্তযুক্ত মুখে লেগে থাকত হাওরের কাঁকড়ার রক্ত। কিন্তু সে শুধু মাছ নয়, মানুষও শিকার করত। যারা চুপিচুপি রাতের বেলায় হাওরে অবৈধভাবে মাছ ধরতে যেত, তাদের আর ফিরে আসা হতো না। টোপরের লাঠির মাথায় ছিল এক জাদু পাথর, যা মৃত মানুষের আত্মাকে শুষে নিত, আর টোপর হয়ে উঠত আরও শক্তিশালী।
একবার এক বাউল দরবেশ টোপরের কাছে যায়—সে বলে, “তুই অভিশপ্ত, টোপর। তোর মুক্তি হোক।”
টোপর হাসে, এক গা-জোড়া কুমিরি হাসি, “মুক্তি চাই না আমি, চাই প্রতিশোধ। তোমরা যারা আমায় ফেলে দিয়েছিলে, তোমাদের সন্তানদের কেউ যেন হাওরের দিকেও না তাকায়!”
দরবেশ জানত, টোপরকে থামাতে হলে তার দৃষ্টিতে চোখ রেখে “মৃত্যুর নাম” বলতে হয়। কিন্তু সেই নাম জানে না কেউ—শুধু এক পুরনো পান্ডুলিপিতে লেখা ছিল, যা এখন কাদার নিচে হারিয়ে গেছে।
তখন থেকেই প্রতি অমাবস্যা রাতে, যখন বাতাসে শীতল হাহাকার শোনা যায়, কেউ কেউ দেখে—এক কুমিরমুখো দানব, ভাঙা এক ডিঙ্গি নিয়ে হাওরের বুকে ঘুরে বেড়ায়, লাঠি ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে খুঁজে ফেরে তার পরবর্তী শিকার।
আর হ্যাঁ, যদি কেউ ভুল করেও হাওরের জলে “টোপর” বলে ডাক দেয়, সে আর কখনও জেগে ওঠে না।