
মাহিন আহমেদ
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়টি থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে অংশ নিয়েছিল মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে বিদ্যালয়টির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
মাত্র পাঁচজন পরীক্ষার্থীকে ঘিরে একটি বিদ্যালয়ের এসএসসি প্রস্তুতি, পাঠদান ও একাডেমিক তদারকির সক্ষমতা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষক থাকার কথা জানা যাওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন ব্যক্তিরা।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ফল প্রকাশের পর পাঁচজনের সবাই অকৃতকার্য হওয়ায় বিদ্যালয়ের পাসের হার শূন্যে নেমে আসে। শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হওয়ায় প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর ওপর ব্যক্তিগতভাবে নজরদারি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও ফলাফলে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, একটি বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী সংখ্যা যদি হাতে গোনা কয়েকজন হয়, তাহলে শিক্ষকরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কারও কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করে বাড়তি ক্লাস, পুনরাবৃত্তিমূলক পাঠদান কিংবা বিশেষ সহযোগিতার ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু পাঁচজনের পাঁচজনই অকৃতকার্য হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক বলেন, শিক্ষার্থী কম থাকার কারণে বরং ফলাফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে সময় দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা। এরপরও কেউ পাস না করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল, শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান করেছেন কি না এবং পরীক্ষার আগে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা দরকার।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জাকিরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, তিনি বাইরে অবস্থান করছেন এবং বিদ্যালয়ের এসএসসি ফলাফল সম্পর্কে তখনো বিস্তারিত জানতে পারেননি। তিনি বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষক থাকার কথা জানান। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবার পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে—এই তথ্যের সঙ্গে এবারের শূন্য পাসের হারের সম্পর্ক কী, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী ধরনের একাডেমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, নিয়মিত মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা পরীক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটাতে কোনো বিশেষ উদ্যোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হয়নি।
এদিকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পাকুন্দিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। শূন্য পাসের হার সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করা হবে। একই সঙ্গে এমন ফলাফলের কারণ জানতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শোকজ করা হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিংবা পাস-ফেলের পরিসংখ্যানই নয়, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, মডেল টেস্ট এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচজন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ায় এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে শুধু শিক্ষকসংখ্যা বেশি থাকলেই ভালো ফলাফল নিশ্চিত হয় না—এমন মতও রয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, অভিভাবকদের সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং পারিবারিক পরিবেশও পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলে। তাই প্রকৃত কারণ জানতে হলে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক কার্যক্রম ও পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পরিদর্শন ও সম্ভাব্য তদন্তের দিকে তাকিয়ে স্থানীয়রা। পাঁচজন পরীক্ষার্থীর কেউ কেন উত্তীর্ণ হতে পারল না—এর পেছনে শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানে ঘাটতি, একাডেমিক তদারকির দুর্বলতা, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির অভাব নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল, তা তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে।
জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এবারের ফলাফল তাই শুধু শূন্য পাসের একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বিদ্যালয়টির পাঠদান, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কার্যক্রম কতটা কার্যকর ছিল—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।