
L
প্রচ্ছদ পরিচিতি:-
উপন্যাসের প্রচ্ছদে আমরা একটি তরুণ-তরুণীর হাতে আঁকা রঙিন পেন্সিল স্কেচ দেখি। একটি শান্ত, আবেগপূর্ণ মুহূর্তে তারা একে অপরের খুব কাছে বসে আছে। তরুণের চোখে গভীর মুগ্ধতা আর তরুণীর মুখে একটি লাজুক কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসি। এই স্কেচটিই গল্পের মূল সুর সেট করে দেয়।
প্রথম দেখা:- কফির কাপে শরৎ
১/ কবির একাকী সন্ধ্যা:-
কবির (প্রচ্ছদের তরুণ), একটি বহুজাতিক কোম্পানির সৃজনশীল পরিচালক। সে একটু অন্তর্মুখী, মানুষের কোলাহলের চেয়ে বই আর কফির কাপে নিজের মতো করে সময় কাটানো বেশি পছন্দ করে। একদিন শরৎকালের এক হালকা বৃষ্টির সন্ধ্যায়, একটি ছোট, শিল্পসম্মত কফি শপে সে বসে ছিল। জানালার বাইরে বৃষ্টির ছাট আর তার সামনে তার প্রিয় স্কেচবুক।
২/ অন্তরার প্রবেশ:-
হঠাৎ করেই যেন কফি শপের পরিবেশ বদলে গেল। একটি তরুণী (প্রচ্ছদের তরুণী) ভিজে একটু দ্রুতপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। তার হাতে একটি বেহালার কেস। সে তার ছাতাটি বন্ধ করে একটা বেঞ্চে বসে, নিজের শরীর থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ঝেড়ে ফেলছিল। তার চুলে তখনো কিছু জলের কণা হীরের মতো জ্বলছিল। সে অন্তরা।
৩/ মুগ্ধতার মুহূর্ত:-
কবির-এর চোখ স্কেচবুক থেকে উঠে অন্তরার উপর স্থির হয়ে গেল। অন্তরার সেই মুহূর্তের সজীবতা, তার আর্দ্র চোখ আর বেহালাটি কবির কে এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে। সে না চাইতেই তার পেন্সিল ঘুরতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্তরার একটি চমৎকার স্কেচ (প্রচ্ছদের মতো) তার খাতায় ফুটে উঠল। অন্তরা অনুভব করল কেউ তাকে দেখছে। সে তাকিয়ে কবির এর চোখে মুগ্ধতা দেখল এবং কবির তার খাতায় কী করছে তা বুঝতে পারল। সে একটু লজ্জা পেল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি দেখা দিল। এভাবেই প্রথম দেখার জাদু কাজ করল।
প্রেমের কাহিনী:- মেঘে ঢাকা তারা
৪/ আলাপ ও বন্ধুত্ব:-
কবির সাহস করে অন্তরার কাছে গিয়ে স্কেচটি উপহার দেয়। অন্তরা ভীষণ খুশি হয়। তারা আলাপ শুরু করে। অন্তরা জানতে পারে কবির শৈল্পিক মনের কথা, আর কবির জানতে পারে অন্তরার সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসার কথা। তাদের মধ্যে দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
৫/ অন্তরার গল্প:-
অন্তরা আসলে একজন উদীয়মান বেহালা বাদক। তার স্বপ্ন বিশ্বের বড় বড় মঞ্চে একক পারফর্ম করা। তার গল্প শুনে কবির অবাক হয় যে সে কত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাদের মধ্যে একের পর এক কফি ডেট, আর্ট গ্যালারি ভিজিট আর মিউজিক কনসার্টে যাওয়া শুরু হয়। তাদের ভালোবাসা ফুল হয়ে ফুটতে থাকে।
৬/ প্রেমের স্বীকৃতি:-
একটি পাহাড়ি অঞ্চলে বন্ধুদের সাথে ট্রিপে যাওয়ার সময়, কবির পূর্ণিমা রাতে পাহাড়ের চূড়ায় অন্তরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার ভালোবাসার কথা জানায়। অন্তরা কাঁদতে কাঁদতে সম্মতি দেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা আজীবন একে অপরের সাথে থাকবে, একে অপরের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করবে। এই অংশটি গল্পে সবচেয়ে সুখী এবং রোমান্টিক সময়। প্রচ্ছদের ছবিটি আসলে তাদের সেই সুখী সময়েরই একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে তারা কোনো এক সন্ধ্যায় একে অপরের হাত ধরে ভালোবাসার গল্প শুনছে।
বিরহ ও বিচ্ছেদ:- অশ্রুর শেষ পাতায়
৭/ স্বপ্নের বাধা:-
তাদের সুখী প্রেমের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে যখন অন্তরার স্বপ্নের কাছে কবির এর সাথে সম্পর্কের সংঘাত শুরু হয়। অন্তরার কেরিয়ারের একটি বড় সুযোগ আসে—লন্ডনের একটি বিখ্যাত মিউজিক স্কুলে পড়াশোনার জন্য তিন বছরের ফুল স্কলারশিপ। এটি অন্তরার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।
৮/ সম্পর্কের সংঘাত:-
কবির তার কাজ এবং কেরিয়ারের কারণে লন্ডনে যেতে পারবে না। তারা এই বিষয়ে অনেক কথা বলে। কবির অন্তরার স্বপ্ন পূরণ করতে চায়, কিন্তু সে নিজেও তার পেশাগত পরিচয় এবং দেশ ছেড়ে যেতে প্রস্তুত নয়। অন্তরা মনে করে কবির তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করছে না, আর কবির মনে করে অন্তরা তার স্বপ্নকে তাদের ভালোবাসার উপরে রাখছে।
৯/ বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:-
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। ফোন কল কমতে থাকে, ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। একদিন, লন্ডনে যাওয়ার ঠিক আগের রাতে, তারা আবার সেই প্রথম কফি শপে মিলিত হয়। তাদের মুখ প্রচ্ছদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখায়—বেদনা এবং অক্ষমতায় ভরা। অন্তরা বলে, সে তাদের সম্পর্কের চেয়ে তার সঙ্গীতকে বেছে নিয়েছে কারণ এটি তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কবির নির্বাক হয়ে বসে থাকে, তার চোখে জল।
১০/ শেষ বিদায়:-
লন্ডনের ফ্লাইটে ওঠার আগে কবির অন্তরাকে একটি ডায়েরি উপহার দেয়। ডায়েরিটির নাম সে রাখে ‘অন্তরা তোমাকে নিয়ে গল্প’। এটি আসলে একটি স্কেচবুক যেখানে তাদের সম্পর্কের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সব স্মৃতি, প্রতিটি স্কেচ এবং কবির এর লেখা প্রেমের কবিতাগুলি আছে। শেষ পৃষ্ঠায় কবির লিখেছিল, “তোমার স্বপ্নের পথে আমি কখনো বাধা হবো না, কিন্তু তোমার স্মৃতি আমার প্রতিটি স্কেচে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে থেকে যাবে।” অন্তরা ডায়েরিটি পড়ে বিমানবন্দর কেঁদে ফেলে। তারা দুজনেই জানে, এই ভালোবাসার আর কোনো মিলন ঘটবে না।
উপসংহার:-
গল্পটি শেষ হয় কবির এর একাকীত্বের দৃশ্যে, যেখানে সে আবার সেই কফি শপে বসে। সে এখন আর শুধু স্কেচ করে না, সে একটি ডায়েরি খুলছে, ‘অন্তরা তোমাকে নিয়ে গল্প’। সে জানে অন্তরা এখন বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, সে তার নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছে। কবির বেদনা অনুভব করে, কিন্তু সাথে সাথে গর্বিতও হয়। এই উপন্যাসটি পাঠকের মনে এক মিষ্টি-বেদনার অনুভূতির জন্ম দেয়, যা প্রেমের শুদ্ধতা এবং বিচ্ছেদের অনিবার্য করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে। প্রচ্ছদের ছবিটি তখন আর শুধু একটি স্কেচ মনে হয় না, মনে হয় হারানো প্রেমের এক চিরস্থায়ী স্মৃতি।
অন্তরা কবির….