
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, বিবেক, মূল্যবোধ ও স্বপ্নকে গড়ে তোলেন। জীবনের কঠিন সময়ে সাহস দেন, ভুল পথে গেলে সঠিক পথ দেখান এবং নিজের অজান্তেই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের ভিত তৈরি করে দেন।
আমার জীবনে এমনই একজন মানুষ হলেন আমার আদর্শ, আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা তাজ স্যার।
১৯৯৭ সাল থেকে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তিনি শিক্ষকতার মহান ব্রত পালন করে চলেছেন। আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা কিছু কথা আমার প্রিয় শিক্ষককে উৎসর্গ করতে চাই।
এটি শুধু একটি লেখা নয়। এটি আমার কৃতজ্ঞতা, আমার ভালোবাসা, আমার অসীম শ্রদ্ধা এবং একজন শিক্ষকের প্রতি একজন শিক্ষার্থীর হৃদয়ের ঋণ স্বীকারের ছোট্ট প্রয়াস।
শেকড় বরিশালে, হৃদয়জুড়ে চট্টগ্রাম ও বান্দরবান
স্যারের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। বরিশালের নদী, খাল-বিল, সবুজ মাঠ আর মানুষের সরলতা যেন তাঁর ব্যক্তিত্বেও ছাপ ফেলেছে। তাঁর কথাবার্তায় এক ধরনের শান্তি, আন্তরিকতা ও মাটির টান অনুভব করা যায়।
তবে কর্মসূত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানের সবুজ পাহাড় ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। শিক্ষা, সমাজসেবা, মানুষের কল্যাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করে চলেছেন।
স্যার প্রায়ই বান্দরবানের পাহাড়, প্রকৃতি ও সহজ-সরল মানুষের গল্প করেন। তাঁর একটি কথা আমার খুব মনে পড়ে—
“প্রকৃতি সবচেয়ে বড় শিক্ষক।”
প্রকৃতির কাছ থেকে তিনি যেমন শিখেছেন, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও শিখিয়েছেন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে, মানুষকে ভালোবাসতে এবং সমাজের জন্য কাজ করতে।
♦️জুলাই ২০২৪: শিক্ষার্থীদের পাশে একজন সাহসী শিক্ষক
স্যারের জীবন ও আদর্শের কথা লিখতে গেলে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গটি অবশ্যই আসবে। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে কী বলেন, তা দিয়েই তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। সংকটের সময়ে তিনি কোথায় দাঁড়ান, সেটিও তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশের অস্থির ও কঠিন সময়ে স্যার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পক্ষে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। বান্দরবানে থেকেও তিনি অনলাইনে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে তাঁর মতামত জানিয়েছেন।
স্যারের তৎকালীন কিছু ফেসবুক পোস্ট তাঁর সেই সময়কার অবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর প্রকাশিত পোস্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
★১৬ জুলাই ২০২৪:
“পথ কোথায়? কোনো সমাধান নেই? কেউ কী নেই হাল ধরার? বিচিত্র জনগণ নয়- বিচিত্র এদেশের রাজনীতি!”
★১৭ জুলাই ২০২৪:
“যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধী, গণতন্ত্রমনা মানুষের বিরুদ্ধে, সেসব লোকেরা হয় ভালো হোন, না হয় আমার ফ্রেন্ড লিস্ট হতে বের হোন। আমি সাধারণ মানুষের পক্ষের।”
★১৭ জুলাই ২০২৪:
“জাতিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে – একদল লোকের মৃত্যু হলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা হয়। জাগো জাগ্রত জনতা। নষ্টের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসি।”
★১৮ জুলাই ২০২৪, শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে:
“বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের প্রেরণার উৎস। ব্যক্তি, দল, মতের উর্ধ্বে আবু সাইদের অবস্থান। হে সাহসী তরুণ! স্যালুট তোমায়। তুমি আমাদের কবিতা, গল্প, ও উপন্যাস। কোনো ক্রান্তিলগ্নে তুমিই হবে আমাদের প্রতীক।”
★২৬ জুলাই ২০২৪:
“নাম আমার জনগণ! আমিই বাংলাদেশ!”
★৩ আগস্ট ২০২৪:
“তরুণ তুমি ভয়ের নও, আতংকের নও, তুমিই আমার বাংলাদেশ, তুমিই আমার অহংকার।”
★৫ আগস্ট ২০২৪:
“একজন কলেজ শিক্ষক হয়ে চেষ্টা করেছি ছাত্রদের সমর্থন দিতে। অনুরোধ কোনো ১ জন ছাত্র দ্বারা যেন সমাজে অঘটন না ঘটে। এ সমাজ তোমার আমার।”
★৫ আগস্ট ২০২৪:
“এই আন্দোলনে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ ছিল। তাই কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বা কোনো স্থাপনায় আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব।”
★৬ আগস্ট ২০২৪:
“দেশের দায়িত্বশীলেরা আপনারা অতিসত্ত্বর শহীদদের বাড়িতে যান ও হাসপাতালে আহতদের পাশে দাঁড়ান।”
এই কথাগুলো শুধু কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নয়। আমার কাছে এগুলো একজন শিক্ষকের বিবেক, সাহস ও মানবিক অবস্থানের দলিল।
তিনি শুধু বাংলা পড়াননি, তিনি আমাদের বিবেকের ভাষা বুঝতে শিখিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সাহসী হতে বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলেছেন এবং সংকটের সময় মানবিক থাকতে শিখিয়েছেন।
তাই আমার বিশ্বাস, অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা তাজ স্যার শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পথপ্রদর্শক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলোর যাত্রা
স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস, পাহাড়, ঝর্ণা, শাটল ট্রেন এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যবোধকে সমৃদ্ধ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দসহ বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের রচনা তিনি শুধু পড়েননি, হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
তাঁর ক্লাসে বাংলা সাহিত্য যখন জীবন্ত হয়ে উঠত, তখন মনে হতো তিনি শুধু একটি বিষয় পড়াচ্ছেন না, আমাদের সামনে একটি বিশাল জগতের দরজা খুলে দিচ্ছেন।
তাঁর উচ্চারণ, শব্দচয়ন, সাহিত্য বিশ্লেষণ এবং পড়ানোর ধরন আজও আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
তিনি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করেননি, সেই জ্ঞান ও আলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
♦️১৯৯৭: বাজালিয়ার মাটিতে আলোর বীজ
১৯৯৭ সাল।
সাতকানিয়ার বাজালিয়ায় অবস্থিত কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম ডিগ্রি কলেজে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা তাজ।
সেই সময় কলেজটি আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন।
এরপর কেটে গেছে ২৮ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেননি, একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। তাঁর চোখের সামনে বদলে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, বদলেছে পাঠদানের পদ্ধতি, এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহার। কিন্তু বদলায়নি শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা।
ব্ল্যাকবোর্ডের চক থেকে আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পর্যন্ত পরিবর্তনের সাক্ষী তিনি।
হাজারো শিক্ষার্থীর কারিগর
দীর্ঘ ২৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন।
কেউ চাকরি করছেন, কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ শিক্ষক হয়েছেন, কেউ উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের স্মৃতিতে আজও রয়ে গেছে তাজ স্যারের ক্লাস, তাঁর উপদেশ এবং তাঁর আন্তরিকতা।
তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধনী-গরিব কিংবা মেধাবী-দুর্বল হিসেবে বিভাজন করেননি।
বরং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর দরজা ছিল আরও বেশি খোলা।
তিনি প্রায়ই বলতেন—
“ভালো ছাত্র তো নিজেই ভালো করবে, দুর্বল ছাত্রকে টেনে তোলাই শিক্ষকের আসল কাজ।”
এই একটি কথার মধ্যেই একজন আদর্শ শিক্ষকের দর্শন লুকিয়ে আছে।
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো
আমার ইন্টারমিডিয়েট জীবনের দুই বছর মানেই তাজ স্যার।
আমার জীবনের অনেক সুন্দর স্মৃতি, সাহস পাওয়ার মুহূর্ত এবং স্বপ্ন দেখার শুরুতেই তিনি জড়িয়ে আছেন।
★প্রথম স্মৃতি: ভয়ের দিনে সাহস
প্রথম বর্ষের প্রথম বাংলা ক্লাস। আমি তখন ভীষণ নার্ভাস।
একদিন উচ্চারণে সামান্য ভুল হওয়ায় আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু স্যার আমাকে বকা না দিয়ে সাহস দিলেন।
তিনি বলেছিলেন—
“তুমি আমাদের মেয়ে, তুমি তো পারবে। শুধু চেষ্টা করো আর ইচ্ছাশক্তি বাড়াও। আমি তো সঙ্গে আছিই, ভয় কিসের? আমি তো শেখাতে এসেছি। তোমরা ভুল করবে আর আমি শুদ্ধ করে দেব। তোমরা তো আমার মেয়ের মতোই। বাবাদের প্রশ্ন করবে, উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত আছি।”
সেদিন তাঁর কথাগুলো আমার ভয় দূর করে দিয়েছিল।
আজও কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তাঁকে ফোন করি। ফোন ধরেই অনেক সময় তাঁর প্রথম প্রশ্ন—
“মামণি, তুমি কেমন আছ?”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই আমি বাবার মতো স্নেহ, মমতা ও আপনজনের ভালোবাসা অনুভব করি।
★দ্বিতীয় স্মৃতি: ব্যর্থতার পর নতুন স্বপ্ন
ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় কিছুটা খারাপ ফল করায় আমি ভেঙে পড়েছিলাম।
স্যার বিষয়টি জানতে পেরে আমাকে ডেকে বুঝিয়েছিলেন, সাহস দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন—
“তুমি পারবে এবং তোমাকে পারতেই হবে। আমি তোমার পাশে আছি।”
সেই কথাগুলো আমাকে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল।
এরপর আমি নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মন দিলাম। শুধু তাই নয়, ক্লাসের বাইরেও আমার দুর্বলতাগুলো বুঝে স্যার প্রায় চার মাসের মতো আমাকে বিশেষভাবে সময় দিয়েছেন, পড়িয়েছেন ও বুঝিয়েছেন।
একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর জন্য এতটা সময়, শ্রম ও মমতা কীভাবে দিতে পারেন, তা আজও আমার কাছে বিস্ময়ের।
আমি জানি না তাঁর এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব কি না।
আজও তাঁর পরামর্শ, সাহস ও দোয়া আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
★তৃতীয় স্মৃতি: বইয়ের জন্য ১৫ শিক্ষার্থীর পাশে
২০২৫ সালে কলেজের কয়েকজন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী বইয়ের অভাবে পড়াশোনা করতে পারছিল না।
স্যার তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে বললেন, তিনি তাঁদের বইয়ের ব্যবস্থা করতে চান।
এক রাতে ফোন করে বললেন—
“মহিমা, তোমার কিছু অনুজ ভাই-বোনের বই দরকার। বইয়ের সমস্যার কারণে তারা পড়তে পারছে না। আমি তাদের বই দেওয়ার কথা দিয়েছি। এখন তুমি আমার ভরসা। কী করা যায় বলো।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী বড় ভাইকে বিষয়টি জানাই। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা করে ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য বই কলেজ পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
এই পুরো বিষয়টি জানতেন স্যার, আমি এবং সেই বড় ভাই।
কোনো প্রচার ছিল না, কোনো ছবি তোলার আয়োজন ছিল না, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ছিল না।
শুধু ছিল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন পূরণের আন্তরিকতা।
এই গোপন মানবিকতার মূল্য আমার কাছে আকাশসম।
★চতুর্থ স্মৃতি: “তোমরাও মহান হও”
স্যার প্রায়ই বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষার ইতিহাসের গল্প করতেন। বাংলা বিভাগের বড় বড় শিক্ষক ও সাহিত্যিকদের কথা বলতেন।
তাঁর মুখে সেই গল্পগুলো শুনতে শুনতে একসময় আমার মধ্যেও বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়।
স্যার প্রায়ই বলতেন—
“তোমরাও মহান হও।”
আজ আমি চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার প্রথম বিষয় হিসেবে বাংলা এসেছিল। পরে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে অন্য বিষয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে স্যারকে নক করি।
স্যার বলেছিলেন—
“এটি সম্পূর্ণ তোমার ইচ্ছা। তুমি কী পড়বে, সিদ্ধান্ত তোমার। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে, বিশেষ করে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে আমি চাই তুমি বাংলাতেই থাকো।”
পরবর্তীতে পরিবার ও নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে আমি বাংলা বিভাগেই থেকে যাই।
আজও সাহিত্য পড়তে বসলে স্যারের কথা মনে পড়ে।
কারণ বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসার পথে আমার প্রথম বড় অনুপ্রেরণাগুলোর একজন তিনি।
স্যার আমার আদর্শ
স্যার আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন।
তিনি আমার আদর্শ, পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষী।
তিনি একজন ভালো মানুষ।
উদারতায় ভরা তাঁর মন। মানুষকে ভালোবাসার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। সততার জায়গায় তিনি দৃঢ়। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধেও তিনি অনুকরণীয়।
আজকের পৃথিবীতে ভালো ফলাফল করা মানুষের অভাব নেই। ভালো চাকরি করা মানুষেরও অভাব নেই।
কিন্তু—
ভালো মানুষ কয়জন?
আমার কাছে তাজ স্যার সেই ভালো মানুষদের একজন।
তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—
“ভালো রেজাল্টের আগে ভালো মানুষ হও।”
আজকের সময়ে এই শিক্ষা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম কলেজে এসেও শেকড় ভুলিনি
আজ আমি চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী।
এখানকার শিক্ষকরা আমাকে নতুন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে চিনিয়েছেন। তাঁদের প্রতিও আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে।
কিন্তু আমার শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন প্রিয় তাজ স্যার।
চট্টগ্রাম কলেজের লাইব্রেরিতে বসে যখন বই পড়ি, সাহিত্য নিয়ে ভাবি, তখন স্যারের একটি কথা মনে পড়ে—
“বই পড়ো, বই কখনো বেইমানি করে না।”
আজ আমি যা কিছু হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছি, তার পেছনে আমার পরিবার, বর্তমান শিক্ষকমণ্ডলী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পাশাপাশি প্রিয় তাজ স্যারের অবদানও অনস্বীকার্য।
সকল শিক্ষার্থীর প্রতি আমার বার্তা
আমি অলি আহমদ কলেজের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীকে বলতে চাই—
তোমরা তোমাদের শিক্ষককে ভালোবাসো।
শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখাও। তাঁর পরামর্শকে গুরুত্ব দাও। শিক্ষকের দোয়া ও শুভকামনার মূল্য বোঝো।
আমরা জানি না ভবিষ্যতে কে কোন নৌকার মাঝি হবো। কিন্তু সত্যের পথে থাকলে, পরিশ্রম করলে এবং ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করলে আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের উত্তম পথ দেখাবেন।
আমি চাই, আমার এই লেখা যদি অন্তত একজন শিক্ষার্থীকে তাঁর প্রিয় শিক্ষকের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে আমার লেখা সার্থক হবে।
আমি চাই, শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলাফলের জন্য নয়, ভালো মানুষ হওয়ার জন্যও শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষা নিক।
প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, তোমরাও তোমাদের প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে লেখো। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাও। কারণ জীবনে অনেক মানুষ আমাদের পথ অতিক্রম করে চলে যায়, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক আমাদের জীবনের পথটাই বদলে দিতে পারেন।
আমি বিশ্বাস করি—
তুমি যদি মন থেকে একজন আদর্শ শিক্ষার্থী হতে চাও, তাহলে একজন আদর্শ শিক্ষককে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করো। নিজে সত্যের ওপর থাকলে সত্যই একদিন তোমাকে বিজয়ী করবে, ইনশাআল্লাহ।
শেষ কথা: প্রিয় স্যার, আপনি ভালো থাকুন
প্রিয় স্যার,
আপনি ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ হায়াত, সুস্বাস্থ্য ও শান্তিময় জীবন দান করুন।
১৯৯৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষকতার যে আলোকিত পথ আপনি অতিক্রম করেছেন, তার প্রতিটি মুহূর্ত অমর হয়ে থাকুক।
আপনি আমাদের জীবনে একজন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকুন। মাথার ওপর ছায়া দেওয়া বিশাল বটবৃক্ষের মতো আজীবন শিক্ষার্থীদের পাশে থাকুন, এটাই আমার প্রার্থনা।
আপনি আমার জীবনের একজন আদর্শ মানুষ।
আপনি শুধু আমার শিক্ষক নন, আপনাকে আমি আমার আপনজনদের একজন মনে করি।
আপনার কাছে আমার যে ঋণ, তা কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
শুধু একটি প্রার্থনা করি—
আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আপনার আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলতে পারি। যেন আপনার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, সাহস, সততা ও মানবিকতাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে পারি।
প্রিয় স্যার,
আপনার দেওয়া আলো যেন আমার মতো আরও হাজারো শিক্ষার্থীর পথ আলোকিত করে।
লেখক:মহিমা জান্নাত
বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম ডিগ্রি কলেজ
বাজালিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম