
মো: জহিরুল ইসলাম
আধুনিকতা আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা মোবাইলে বিশ্ব দেখি। ঘরে বসে অফিস করি, অনলাইনে ক্লাস করি, এক ক্লিকে কেনাকাটা করি। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী। কিন্তু এত প্রাপ্তির ভিড়েও একটা প্রশ্ন থেকেই যায় — আমরা কি সত্যিই সুখী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৪০ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩ কোটির বেশি। যার মধ্যে বড় একটি অংশ দিনে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায়। এত সংযোগ, এত বন্ধু, এত লাইক-কমেন্টের পরেও মানুষ দিন শেষে একা হয়ে যাচ্ছে। আর এই একাকীত্ব থেকেই মানুষ আবার প্রকৃতির দিকে ফিরছে।
*কেন মানুষ প্রকৃতিতে ফেরে?*
প্রথম কারণটি বৈজ্ঞানিক। প্রকৃতি আমাদের স্নায়ুকে শান্ত করে। জাপানে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি আছে, যার নাম ‘শিনরিন-ইয়োকু’ বা ফরেস্ট বাথিং, অর্থাৎ বনের মধ্যে স্নান। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ মিনিট সবুজের মধ্যে নীরবে হাঁটলে বা বসে থাকলে আমাদের শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমে যায়। কর্টিসল হলো মানসিক চাপের হরমোন। শহরের যানজট, শব্দদূষণ, ধোঁয়া আর অনবরত নোটিফিকেশনের কারণে এই হরমোন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ফলে আমাদের ঘুম কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়, কোনো কাজে মন বসে না। কিন্তু পাহাড়ের খোলা বাতাস, চা বাগানের নীরবতা এই হরমোনকে স্বাভাবিক করে দেয়। প্রকৃতি কোনো ওষুধ নয়, কিন্তু এটি বিনা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ওষুধের মতো কাজ করে।
দ্বিতীয় কারণটি দার্শনিক। প্রকৃতি আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়। আমরা এখন ইনস্ট্যান্ট যুগে বাস করি। ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ইনস্ট্যান্ট রেজাল্ট, ইনস্ট্যান্ট ভাইরাল। আমরা চাই সবকিছু এখনই হোক। কিন্তু প্রকৃতি কখনো এখনই দেয় না। একটি আম গাছ লাগালে ফল পেতে ৪ থেকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়। বান্দরবানের পাহাড়ে জুম চাষীরা এখনও সেই অপেক্ষাটা জানেন। তারা পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ করেন। এক মৌসুমে বীজ বোনেন, তারপর মাসের পর মাস বৃষ্টির জন্য, ফসলের জন্য অপেক্ষা করেন। এই অপেক্ষার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো হতাশা নেই। আমাদের অস্থির প্রজন্মের জন্য এই শিক্ষাটা খুব জরুরি। প্রকৃতি আমাদের শেখায় — সময় হলে সব হবে।
*চন্দ্রনাথ থেকে চা বাগান — আমাদের কাছের প্রকৃতি*
শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে আমাদের খুব দূরে যেতে হয় না। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড় তেমনই এক আশ্রয়স্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১১৫২ ফুট। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পাহাড়ে ওঠেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে এক ভিন্ন জগতের দেখা মেলে। মাথার ওপর মুক্ত আকাশ, পায়ের নিচে বিস্তীর্ণ সবুজের সমুদ্র, আর দূরে বঙ্গোপসাগরের আবছা রেখা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, চূড়ায় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় থাকে না। আর এই নেটওয়ার্ক না থাকাটাই আজকের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি। সেখানে কেউ ফোন করে না, কোনো গ্রুপ মেসেজের শব্দ বাজে না। থাকে শুধু বাতাসের বয়ে যাওয়ার শব্দ আর নিজের নিঃশ্বাসের ছন্দ। তখনই উপলব্ধি হয়, সুখ আসলে খুব বড় কোনো প্রাপ্তি নয়, কখনো কখনো একটুখানি নীরবতাই সবচেয়ে বড় সুখ।
চা বাগানের অনুভূতি আবার অন্যরকম। সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী চা বাগানে গেলে দেখা যায় সারি সারি চা গাছ। ব্রিটিশ আমল থেকে এই বাগানগুলো টিকে আছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে, যার মধ্যে ২২টি চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থিত। এই বাগানগুলো শুধু চা উৎপাদন করে না, আমাদের পরিবেশকেও রক্ষা করে। চা গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, বাতাসকে ঠান্ডা রাখে, বৃষ্টি ধরে রাখে। বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হয় সময়টা যেন থেমে গেছে। শহরে সকাল কখন বিকেল হয় টের পাওয়া যায় না, কিন্তু চা বাগানে এক কাপ চা হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যায়। এই তাড়াহীন সময়টাই আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
*বান্দরবান — মেঘের রাজ্যে সুখের খোঁজ*
আধুনিক মানুষের প্রকৃতিতে ফেরার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বান্দরবান। বান্দরবানকে বলা হয় ভূ-স্বর্গ। বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে এটি সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। এর আয়তন ৪৪৭৯ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৯০ শতাংশই পাহাড় ও বনভূমি। এখানেই রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ পর্বত সাকা হাফং, যার উচ্চতা ৩৪৬৫ ফুট এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কেওক্রাডং, উচ্চতা ৩১৭২ ফুট।
বান্দরবানের প্রতিটি জায়গা একেক রকম সুন্দর। নীলগিরির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২০০ ফুট। সেখানে দাঁড়ালে মনে হয় মেঘ পায়ের নিচে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। নীলাচল থেকে পুরো বান্দরবান শহর দেখা যায়। বগালেক বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর প্রাকৃতিক হ্রদ, এর গভীরতা প্রায় ১২৪ ফুট। স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই লেকটি ড্রাগনের তৈরি। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা উল্কাপাতের ফলে সৃষ্টি। আর আছে ডিম পাহাড়, বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক, যেখানে মেঘের ভেতর দিয়ে গাড়ি চলে।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের তথ্য মতে, বান্দরবানে প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই তরুণ। তারা কেন যান? শুধু ছবি তোলার জন্য নয়, তারা যান নিজেকে খুঁজে পেতে। বিশাল পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে মানুষ বুঝতে পারে সে কত ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্রতা অনুভব করাটা খুব জরুরি। ফেসবুকে আমরা সবাই নিজেকে বড় দেখাতে চাই। কিন্তু পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সব অহংকার মাটিতে মিশে যায়। এই উপলব্ধিটাই মানুষকে বিনয়ী করে, মানুষকে মানুষের কাছাকাছি আনে।
তবে দুঃখের বিষয়, আমরা প্রকৃতির কাছে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতিকে নষ্টও করছি। বান্দরবানের থানচি থেকে নীলগিরি, চন্দ্রনাথ থেকে সাজেক — সবখানেই এখন প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন পড়ে থাকে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধু পর্যটন এলাকাগুলোতেই প্রতি বছর প্রায় ১০ টন অপচনশীল বর্জ্য জমা হয়। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। ২০২৪ সালে বান্দরবানে ভূমিধসে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার অন্যতম কারণ ছিল অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা। আমরা যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসি, তাহলে তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। নিজের ফেলে যাওয়া ময়লাটা সাথে করে নিয়ে আসা — এই ছোট অভ্যাসটাই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আমাদের দাদা-দাদির জীবন ছিল প্রকৃতিকেন্দ্রিক। ভোরে উঠে উঠোন ঝাড়ু দেওয়া, পুকুরে গোসল, গোয়ালে গরুকে খাওয়ানো — তাদের জীবনে কোনো বিষণ্ণতা ছিল না। কারণ তাদের জীবনে প্রকৃতি ছিল। আমরা ফ্ল্যাটে উঠেছি, এসি লাগিয়েছি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঘামছি। কারণ আমরা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। মানুষ গাছের মতো। শেকড় ছাড়া গাছ বেশিদিন বাঁচে না।
তাই দিন শেষে আমরা সবাই একটু সবুজ খুঁজি। কেউ বারান্দায় মানি প্ল্যান্ট লাগায়, কেউ ছাদে লাউ গাছ লাগায়, কেউ ফোনের ওয়ালপেপারে বান্দরবানের মেঘের ছবি রাখে। এই ছোট ছোট সবুজই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
আধুনিকতা থাকবে, প্রযুক্তি আরও এগোবে। কিন্তু প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রকৃতিকেও সাথে রাখতে হবে। উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। কারণ দিন শেষে, সব আধুনিকতার পরেও মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। আর সন্তান যতই দূরে যাক, দিন শেষে মায়ের কোলেই শান্তি খোঁজে। প্রকৃতিই আমাদের শেষ আশ্রয়।