
ওমর ফারুক, রংপুর।
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকৃতির জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঘোষিত বাজেটটি নিয়ে সারা দেশের মতো উত্তরের জনপদ রংপুরেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মফস্বলের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাকক্ষ—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই: এই বিশাল বাজেট তিস্তা-যমুনা বিধৌত অবহেলিত এই অঞ্চলের ভাগ্য বদলাতে কতটা ভূমিকা রাখবে?
রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য যেকোনো বাজেটই কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তির এক বার্ষিক দলিল। বিগত কয়েক দশক ধরে শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চরম আঘাত সহ্য করা এই অঞ্চলের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি গভীর প্রাসঙ্গিকতা বহন করছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটটি এমন এক সময়ে এলো যখন দেশ এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকারের এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা (৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা) ধরা হয়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এক মরিয়া চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। রংপুর অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এই বাজেটের মূল প্রাসঙ্গিকতা লুকিয়ে আছে কৃষি খাতের প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতির মধ্যে।
কেন এই বাজেট রংপুরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
বাজেটে বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা সরাসরি রংপুর অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের পকেটকে প্রভাবিত করবে। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক কারণ ও কার্যপ্রভাব কাজ করছে।
আলু,পেঁয়াজ রসুন ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর সিদ্ধান্তটি রংপুরের বাজারে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতায় রংপুরের মানুষকে উচ্চ মূল্যে এসব পণ্য কিনতে হতো, কর হ্রাসের ফলে স্থানীয় বাজারে এর সুফল মিলবে।
তাৎপর্য মূল্যায়ন
রংপুরের অর্থনীতিবিদ ও সুধী সমাজের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো এর “বিকেন্দ্রীকরণ এবং জলবায়ু বাজেট(Climate Budget) সংক্রান্ত বরাদ্দ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫১,৭৪৬ কোটি টাকা করা হয়েছে।
নদীভাঙন কবলিত চিলমারী, নাগেশ্বরী কিংবা কাউনিয়ার মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। যদি এই জলবায়ু বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক কাজ বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ব্যয় করা হয়, তবে তা এই অঞ্চলের জন্য
ঐতিহাসিক এক মাইলফলক হবে।
রংপুরের অর্থনীতিবিদ ও সুধী সমাজের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো এর “বিকেন্দ্রীকরণ” এবং “জলবায়ু বাজেট” (Climate Budget) সংক্রান্ত বরাদ্দ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫১,৭৪৬ কোটি টাকা করা হয়েছে।
নদীভাঙন কবলিত চিলমারী, নাগেশ্বরী কিংবা কাউনিয়ার মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। যদি এই জলবায়ু বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক কাজ বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ব্যয় করা হয়, তবে তা এই অঞ্চলের জন্য
ঐতিহাসিক এক মাইলফলক হবে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক বিশ্লেষণ করে বলেন, “এই বাজেটটি মূলত সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করার একটি চেষ্টা। তবে রংপুরের মতো অবহেলিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ আঞ্চলিক বরাদ্দ (Regional Allocation) থাকা উচিত ছিল। রাজস্ব আদায়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা যদি পূরণ না হয়, তবে প্রথম কোপটা পড়বে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) ওপর, যার ভুক্তভোগী হবে রংপুরের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো।
সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট রংপুর অঞ্চলের জন্য একাধারে সম্ভাবনা এবং প্রচ্ছন্ন আশঙ্কার এক জটিল সমীকরণ। কৃষি খাতের সুরক্ষা এবং কর হ্রাসের প্রস্তাবগুলো নিঃসন্দেহে প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে। তবে বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং তা মেটাতে ব্যাংকিং খাতের ওপর সরকারের অতি-নির্ভরতা স্থানীয় বেসরকারি খাতের বিকাশকে শ্লথ করে দিতে পারে।
রংপুরের মানুষের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের সংখ্যার ওপর নয়, নির্ভর করছে এর বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। তিস্তার চরের খরা কিংবা ভাঙনকবলিত মানুষটি যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে বাজেটের সুফল সরাসরি ভোগ করতে পারে—২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটাই হোক নীতিপ্রণেতাদের মূল অগ্রাধিকার।